রাজধানীর বুকে আবারও এক নিদারুণ ও নির্মম ঘটনা ঘটল। নিজের বাড়ির সামনে খেলতে থাকা আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করেছে ষাটোর্ধ্ব এক প্রতিবেশী। ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা কলাবাগানে। এই জঘন্য অপরাধের অভিযোগে পুলিশ ওই বৃদ্ধকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল শনিবার তাকে আদালতের মাধ্যমে সোজা কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। এমন অমানবিক ও ঘৃণ্য ঘটনায় পুরো কলাবাগান এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে কলাবাগান এলাকার নর্থ সার্কুলার সড়কের একটি বাড়িতে এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ওই বৃদ্ধ নিজের ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গেই ওই বাড়িতে বসবাস করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি তাদেরই এক প্রতিবেশীর সন্তান। শুক্রবার রাতে শিশুটি নিজের বাড়ির সামনে অন্য সময়ের মতোই আপন মনে খেলছিল। ঠিক সেই সময়ে ওই বৃদ্ধ শিশুটির কাছে আসেন এবং চকলেট দেওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখান।
আট বছরের অবুঝ শিশুটি চকলেটের লোভে পা দিয়ে ওই বৃদ্ধের সাথে তার ঘরে যায়। আর তখনই সেই পাষণ্ড বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে শিশুটি ব্যথায় ও ভয়ে চিৎকার শুরু করে। শিশুটির তীব্র চিৎকার শুনে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভয় পেয়ে যান এবং তাড়াহুড়ো করে ঘরের দরজা খুলে দেন। ততক্ষণে আশপাশের লোকজন ও প্রতিবেশীরা শিশুটির কান্নার আওয়াজ শুনে সেখানে ছুটে আসেন। তারা দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং অভিযুক্ত বৃদ্ধকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এরপর এলাকাবাসী দেরি না করে সাথে সাথেই কলাবাগান থানায় খবর দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে রাতেই কলাবাগান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। ওসি ফজলে আশিক আরও জানান, পুলিশি জেরার মুখে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তি নিজের মুখে ধর্ষণের কথা সম্পূর্ণ স্বীকার করেছেন। নিজের ভাইয়ের বাসায় থেকে এমন জঘন্য অপরাধ করায় খোদ অভিযুক্তের পরিবারও চরম লজ্জায় পড়েছে। শনিবার তাকে আদালতে হাজির করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে, এই নির্মম ঘটনার শিকার শিশুটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে সবাই গভীর চিন্তায় পড়েন। পুলিশ দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নিয়ে যায়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা শিশুটির প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা শিশুটিকে তার পরিবারের সঙ্গে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেন। তবে শিশুটি এখনো চরম ট্রমা বা মানসিক ঘোরের মধ্যে রয়েছে। এমন একটি ঘটনা তার কচি মনে যে ভয়ংকর দাগ কেটেছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
আমাদের সমাজে শিশুদের ওপর এমন নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা প্রতিটি মা-বাবার জন্য চরম আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশে ঘটা শিশু নির্যাতনের প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% ক্ষেত্রেই অপরাধী হয় শিশুর কোনো পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিবেশী বা আত্মীয়। মানুষ এখন নিজের প্রতিবেশীকেও বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছে। একটি মধ্যবিত্ত বা গরিব পরিবারের জন্য এমন আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াও অনেক কঠিন। মামলা চালানো, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি খরচ করতে হয়। এই বিপুল খরচের ভয়ে অনেকেই অনেক সময় শেষ পর্যন্ত বিচার চাইতে সাহস পান না।
কলাবাগানের নর্থ সার্কুলার রোডের স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার পর থেকে চরম ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, একজন বয়স্ক মানুষ, যাকে সবাই বয়সের কারণে সম্মান করে, তার কাছ থেকে এমন জানোয়ারের মতো আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এমন অপরাধীদের যদি দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে সমাজে এমন অপরাধ চলতেই থাকবে। ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার এখন প্রশাসনের কাছে শুধু একটাই দাবি করছে—তারা তাদের সন্তানের ওপর হওয়া এই অনাচারের ১০০% সুষ্ঠু বিচার চায়। সরকারের উচিত এমন স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শেষ করে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ চকলেটের লোভ দেখিয়ে কোনো নিষ্পাপ শিশুর জীবন ধ্বংস করতে সাহস না পায়।















