রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের পর খণ্ডিত করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে তীব্র শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে এই বর্বরোচিত ঘটনার পর পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিজেদের কাজ শেষ করেছে। গতকাল রোববার বিকেলে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন পুলিশের দেওয়া অভিযোগটি আমলে নিয়ে আগামী ১ জুন অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ঠিক করেছেন। মামলা হওয়ার মাত্র ৫ দিনের মাথায় তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার এই ঘটনা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি অভাবনীয় মাইলফলক। দেশের স্মরণকালে এত কম সময়ে অন্য কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার নজির আর নেই।
এই রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৯ মে। ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নৃশংস এই অপরাধ ঘটানোর পর মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের গ্রিল ভেঙে সুকৌশলে পালিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ওই বাসা থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ওই দিন সন্ধ্যায়ই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ঘাতক সোহেল রানা ধরা পড়ে। পরের দিন শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০ মে বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে সোহেল রানা নিজের দোষ অকপটে স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। সেখানে সে শিশুটিকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার কথা স্বীকার করে।
ঘটনাটি এতটাই মর্মান্তিক ছিল যে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২১ মে রাতে মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করার পর তিনি সরাসরি নিহত শিশুটির শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার কঠিন আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনার পর প্রশাসন বিদ্যুৎ বেগে কাজ শুরু করে। মাত্র চার দিনের মাথায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা পড়ে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার হাতে তুলে দেয়। সাধারণত উন্নত বিশ্বে এমন নিখুঁত একটি ডিএনএ প্রোফাইলিং করতে সরকারের প্রায় ৫০০
থেকে১০০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। সরকার এই মামলার স্পর্শকাতরতা বুঝে সব খরচ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করেছে।
এই মামলার বিচারকাজ অত্যন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে শেষ করতে সরকার আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনিই রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলাটি পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে, এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আসামিপক্ষের হয়ে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে দেশের আইন অনুযায়ী একজন ভয়ংকর অপরাধীরও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। তাই বিচারকাজ এগিয়ে নিতে সরকার সম্পূর্ণ নিজ খরচে মুসা কালিমূল্যাহ নামের এক আইনজীবীকে আসামিপক্ষের হয়ে লড়ার জন্য নিয়োগ দিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় তাকে এই দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় আবারও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষ এই ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করে পথে নেমেছে। এর আগে দেশে দ্রুততম বিচারের নজির ছিল মাগুরার আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি। গত বছর সেই ঘটনার পর ৩৭ দিনের মাথায় পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছিল এবং ৭৩ দিনের মাথায় আদালত রায় ঘোষণা করেন। ওই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের ১০০% দাবির মুখে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনে। ২০২৫ সালে আনা সেই যুগান্তকারী সংশোধনীর কারণে এখন পুলিশ ও আদালত অত্যন্ত কম সময়ে তদন্ত ও বিচারকাজ শেষ করতে পারছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে এই আইনকে আরও কার্যকর হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।
এই অমানবিক ঘটনার বিচারকাজ নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত এক সংলাপে তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেন, আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই এই মামলার বিচারকাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি জানান, অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে। আসামিকে মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার, এক দিনের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তি আদায় এবং তিন দিনের মধ্যে ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পাওয়া—এসবই পুলিশের বিশাল সাফল্য। শনিবার রাতের মধ্যেই পুলিশ সব কাজ গুছিয়ে এনে দ্রুত অভিযোগপত্র তৈরি করেছে।
সমাজে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক অবক্ষয়কে সরাসরি দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, আমাদের সমাজের অন্তত ৮০% মানুষ এখন ভিনদেশি অপসংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। ধর্মীয় ও পারিবারিক সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে সমাজে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটছে। সমাজকে এই ভয়াবহ অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে সবার সম্মিলিত চেষ্টা প্রয়োজন। তবে সরকার নিজের জায়গা থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ভবিষ্যতে নারী ও শিশুর ওপর এমন কোনো ঘৃণ্য অপরাধ করলে অপরাধীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে দেশবাসীকে জানিয়েছেন।
















