ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ধসে পড়া সড়কে চরম দুর্ভোগ, জীবনের ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার আলুকদিয়া গ্রামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ধসে গিয়ে বর্তমানে বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। উপজেলার সুন্দরপুর-দূর্গাপুর ইউনিয়নের এই রাস্তাটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নিজেদের নানা প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। কিন্তু গত প্রায় এক বছর ধরে রাস্তার একটি বড় অংশ ভেঙে সম্পূর্ণভাবে পাশের খালের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে চরম ঝুঁকি নিয়ে এই ভাঙা পথ দিয়েই এলাকার মানুষকে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও রাস্তাটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সবার জন্যই এই পথ এখন রীতিমতো একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এই ভাঙা রাস্তার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। কালীগঞ্জের এই এলাকাগুলোর মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হলো কৃষি। কিন্তু রাস্তা ভেঙে যাওয়ার কারণে কৃষকরা তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত ফসল কোনোভাবেই বাজারে নিতে পারছেন না। আগে যেখানে পিকআপ বা ভ্যানে করে খুব সহজেই ফসল পরিবহন করা যেত, এখন সেখানে কোনো ভারী বা মাঝারি যানবাহন ঢুকতেই পারে না। ফলে এলাকার কৃষকদের পরিবহন খরচ প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক মাথায় বা কাঁধে করে ফসল নিয়ে যাচ্ছেন। সঠিক সময়ে ফসল বাজারে নিতে না পারায় অনেকের খেতের ফসল নষ্ট হচ্ছে, যা তাদের আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

দিনের বেলায় কোনোমতে পার হওয়া গেলেও রাতের বেলায় এই ভাঙা সড়কের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। রাস্তার যে অংশটি ভেঙে খাদের সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে বিপদের সংকেত হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে একটি বাঁশের লাঠির মাথায় লাল কাপড় বেঁধে রেখেছেন। কিন্তু রাতের অন্ধকারে বা কুয়াশার মধ্যে সেই লাল কাপড় মোটেও চোখে পড়ে না। ফলে অপরিচিত কোনো মানুষ যদি রাতে মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান বা বাইসাইকেল নিয়ে এই পথে আসেন, তবে তারা সরাসরি ওই খাদের পানিতে পড়ে যান। ইতিমধ্যে এমন বেশ কয়েকটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন। অসুস্থ বা গর্ভবতী রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই রাস্তাটি এখন ১০০% ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে এই সেতু ও রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আলাইপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর খালের ওপর নির্মিত এই ব্রিজটি তৈরিতে সে সময় চুক্তি মূল্য ধরা হয়েছিল ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৮ টাকা। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণ প্রায় ১৪,০০০$ (ডলার) এর সমান। মূল ব্রিজের দুই পাশে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের সুবিধার জন্য আলাদা বাজেট দিয়ে ইটের সলিং করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের এক যুগ পার না হতেই এই রাস্তার এমন করুণ দশা এর নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

এই একটি মাত্র ভাঙা রাস্তার কারণে শুধু আলুকদিয়া নয়, বরং সিংদহ, আলাইপুর, শিবনগর, চাচড়া, গান্না এবং কালুখালিসহ আশপাশের আরও বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে গেছে। সরাসরি কোনো বড় যানবাহন চলতে না পারায় গ্রামের মানুষকে এখন বাধ্য হয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ বেশি ঘুরে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে তাদের যেমন প্রতিদিন অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি যাতায়াত খরচও মানুষের মাসিক বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ ফেলছে। বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বাকি ইট ও বালু ধুয়ে সরাসরি খালের পানিতে চলে যাচ্ছে।

রাস্তার ভাঙন এখন শুধু চলাচলের পথেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ধীরে ধীরে পাশের বসতবাড়ি, বড় গাছপালা এবং ফসলি জমিতে গিয়ে ঠেকেছে। খালের ভাঙন প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে নির্ঘুম রাত পার করছেন। তারা ভয় পাচ্ছেন, এভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুতই আলুকদিয়া গ্রামের অনেক মানুষ নিজেদের সহায়-সম্বল হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম চরম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। প্রতিদিন আমাদের এই বিশাল ভোগান্তি দেখার যেন কেউ নেই। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে হয়তো একসময় আমাদের বাড়িঘরও এই খালে বিলীন হয়ে যাবে।

পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে গেলে চোখে পড়ে এক করুণ ও হতাশার দৃশ্য। রাস্তার ইট, বালু আর সুরকি ধসে পাশের গভীর খালের মধ্যে পড়ে আছে। প্রতিদিন ছোট ছোট যানবাহনগুলো এই ধসে যাওয়া স্থানে এসে আটকে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এলাকার সাধারণ মানুষ, কৃষক এবং সচেতন মহল এখন জরুরি ভিত্তিতে এই রাস্তা এবং ব্রিজ সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী সৈয়দ শাহারিয়ার আকাশ জানান, তারা রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং দ্রুত এটি মেরামতের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া, কোনো সাময়িক সমাধান নয়, বরং একটি স্থায়ী ও মজবুত রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে তাদের এই দীর্ঘদিনের চরম দুর্ভোগের দ্রুত অবসান ঘটানো হোক।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ