ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডভোকেসি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে এসএমসির আর্থিক সহায়তায় সীমান্তিক সংস্থা এই চমৎকার সভার আয়োজন করে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের পরিধি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতেই মূলত এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়।
এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অরুণ কুমার দাস। এছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষক, উপজেলা সুপারভাইজার, ডিটিএল মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সীমান্তিকের অন্যান্য মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা। উপজেলা পর্যায়ের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এই সভার গুরুত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
সভার মূল আলোচনা ছিল ‘ মবিলাইজেশন’ বা সমাজের মানুষকে একত্র করে সচেতন করার কর্মসূচি নিয়ে। সীমান্তিকের কর্মীরা জানান, তারা সমাজের সক্ষম দম্পতি এবং যেসব মায়ের ৫ বছরের নিচে শিশু আছে, তাদের নিয়ে ছোট ছোট দলীয় সভা করছেন। এছাড়া যারা নতুন বিয়ে করেছেন, সেই সব নবদম্পতিদের নিয়েও তারা নিয়মিত মিটিং করছেন। এই মিটিংগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আমাদের দেশে এখনও অনেক মা ও শিশু সঠিক পুষ্টির অভাবে ভোগে, তাই এই ধরনের কাউন্সেলিং গ্রামের মানুষের জন্য খুবই দরকারি।
শুধু বয়স্কদের জন্যই নয়, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও কাজ করছে সীমান্তিক। সভায় জানানো হয়, উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে তারা নিয়মিত ‘স্কুল হেলথ সেশন’ পরিচালনা করছেন। সেখানে বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ছেলেমেয়েদের খোলামেলা ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে অসংক্রামক রোগ (যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ) সম্পর্কে সচেতন করতে বিভিন্ন হাট-বাজার এবং জনবহুল স্থানে নিয়মিত স্বাস্থ্যমেলার আয়োজন করার বিষয়েও সভায় জোর দেওয়া হয়।
গর্ভবতী মায়েদের সুরক্ষায় সীমান্তিকের উদ্যোগগুলো সভায় বেশ প্রশংসিত হয়। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, মিডওয়াইফ ও প্যারামেডিকদের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের প্রাথমিক চেকআপ, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ এবং বাড়িতে ডেলিভারি না করিয়ে অবশ্যই হাসপাতালে ডেলিভারি করানোর জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গ্রামে এখনও অনেকে হাসপাতালে যেতে ভয় পান, ফলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সীমান্তিক প্রতি মাসে ১৫টি নির্দিষ্ট সেবা কেন্দ্রে এমন সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া শিশুদের ওজন মেপে তাদের পুষ্টির অবস্থা নির্ণয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস যেমন- যক্ষ্মা দিবস, নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালনের উদ্যোগগুলোও প্রশংসনীয়।
নারীদের স্বাবলম্বী করতে সীমান্তিকের ‘গোল্ডস্টার মেম্বার’ বা মহিলা উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি সভায় সবার নজর কাড়ে। গ্রামের নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে তাদের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য সামগ্রী ন্যায্যমূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোক্তারা যাতে ঠিকমতো কাজ করতে পারেন, সেজন্য প্রতি মাসে তাদের নিয়ে আলাদা মিটিংও করা হয়। এর ফলে গ্রামের নারীরা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও একটি বড় পরিবর্তন আসছে।
সীমান্তিকের এমন বহুমুখী ও জনবান্ধব কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদসহ উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারা। তারা আশ্বস্ত করেন যে, গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সীমান্তিকের যেকোনো উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে এবং সব ধরনের সহযোগিতা করবে। সবশেষে সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
















