সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শীর্ষ পদে পরিবর্তন এনেছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক মো. খায়রুল ইসলাম। তিনি এতদিন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গতকাল শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এই নতুন নিয়োগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। একই প্রজ্ঞাপনে আগের উপাচার্য অধ্যাপক এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীকে তাঁর পদ থেকে সরকার অব্যাহতি দিয়েছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি এই নতুন নিয়োগে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। প্রজ্ঞাপনে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে যে, নতুন উপাচার্যের এই নিয়োগ অবিলম্বে কার্যকর হবে। প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াতে এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সরকার এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শিক্ষাঙ্গনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক মো. খায়রুল ইসলামের ক্যাম্পাসে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি শুধু ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধানই নন, এর আগে তিনি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন হিসেবেও অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের সংগঠনেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) শাবিপ্রবি শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই বহুমুখী প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সবাই আশা করছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনে নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব ও মেয়াদের বিষয়ে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দিয়েছে। নিয়মানুযায়ী, অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম আগামী চার বছরের জন্য এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তাঁর নিয়মিত চাকরির অবসরের সময় যদি এর আগে চলে আসে, তবে অবসরের তারিখ পর্যন্তই তিনি উপাচার্য পদে বহাল থাকবেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি তাঁর মূল পদের সমান বেতন ও ভাতা পাবেন। সরকারের নিয়ম মেনে তিনি অন্যান্য সুবিধাও ভোগ করবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে তাঁকে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পানের ভেতরেই অবস্থান করতে হবে।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকার তাঁর ওপর যে বিশাল গুরুদায়িত্ব দিয়েছে, সে জন্য তিনি মন থেকে কৃতজ্ঞ। একা কোনো কিছু করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সব অংশীজনকে নিয়ে একযোগে কাজ করতে চান। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো শাবিপ্রবির সার্বিক উন্নয়ন ও বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করা। সামনের দিনের পথচলায় তিনি সবার কাছে দোয়া, আন্তরিক সহযোগিতা ও পূর্ণ সমর্থন চেয়েছেন।
শাবিপ্রবি দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বর্তমানে গবেষণার দিক থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশ এগিয়ে আছে। তবে শিক্ষার্থীদের অনেক দিনের দাবি, গবেষণার জন্য বার্ষিক বাজেট অন্তত ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এখানেও আধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রযুক্তি খাতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্পের জন্য অনেক সময় ৫০,০০০থেকেশুরুকরে১,০০,০০০
পর্যন্ত বিদেশি অনুদান লাগে। নতুন উপাচার্য এই আর্থিক বিষয়গুলো এবং বিদেশি ফান্ড আনার ক্ষেত্রে কীভাবে শিক্ষকদের সহায়তা করেন, সেদিকে সবার নজর থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সংকট দেখা গেছে। শাবিপ্রবিও এর বাইরে নয়। সেশনজট কমানো, শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধান এবং ক্যাম্পাসের শতভাগ (১০০%) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নতুন উপাচার্যের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশা করছে, নতুন প্রশাসন সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করবে। শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব যেন শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না করে, প্রশাসনকে সেই দিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।
সিলেটের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ক্যাম্পাসের আশপাশে মেস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসা মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলে অন্তত ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ভালোভাবে চলে। তাই পরিবর্তনের এই হাওয়া শাবিপ্রবির জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে বলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম তাঁর মেধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে আরও ওপরের দিকে নিয়ে যাবেন, এটাই এখন সিলেটসহ পুরো দেশের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।
















