ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও দমন-পীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বিশাল এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। শুক্রবার জুমার নামাজের পর কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার উদ্যোগে শহরের প্রাণকেন্দ্র মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই প্রতিবাদী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ভারতের এমন সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষোভ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
জুমার নামাজ শেষ হতেই উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, তৌহিদী জনতা এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা ছোট-বড় মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে এসে জড়ো হতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো বাসস্ট্যান্ড এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এ সময় উপস্থিত জনতার মুখে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদী স্লোগান শোনা যায়, যা পুরো এলাকাকে মুখরিত করে তোলে। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে অংশগ্রহণকারীরা অত্যন্ত সোচ্চার হন। তাদের দাবি, ভারতে বসবাসরত প্রায় ২০ কোটির বেশি বা জনসংখ্যার ১৪% এরও বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব ভারত সরকারের, কিন্তু তারা সেখানে চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
নেতাদের বক্তৃতা ও প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। হাজার হাজার মানুষের এই মিছিলটি কোটচাঁদপুর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এসে শেষ হয়। মিছিল চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা ভারতের মুসলিমবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং স্লোগান দেন। সাধারণ মানুষও এই মিছিলে সমর্থন জোগান। শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি রাস্তার ধারের দোকানদার ও পথচারীরাও দাঁড়িয়ে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের প্রতি নিজেদের সংহতি প্রকাশ করেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে স্থানীয় অনেক শীর্ষ পর্যায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার সাবেক সেক্রেটারি ও সিনিয়র প্রভাষক শরিফুল ইসলাম, পৌর সেক্রেটারি মাহফুজুল হক মিন্টু, হেফাজতে ইসলাম নেতা হাফেজ নুরনবী আশেকী এবং মেইন বাসস্ট্যান্ড বাইতুন নূর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা খালিদ হাসান বিন শহিদ। এছাড়া হাফেজ আলী আজম, মাওলানা ইসমাইল হোসেন, নুরুল কবির, হাফেজ ইব্রাহিম ও আবুল বাশারসহ আরও অনেক স্থানীয় ধর্মীয় নেতা সেখানে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত জোরালো ও আবেগময় বক্তব্য প্রদান করেন।
বক্তারা তাদের দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরীহ মুসলিমদের ওপর যে ধরনের নির্মম দমন-পীড়ন, পরিকল্পিত হামলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ চালানো হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের একেবারে চরম লঙ্ঘন। তারা অভিযোগ করে বলেন, কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভয়ভীতি ও সহিংসতার মধ্যে রাখার অপচেষ্টা করছে। অনেক জায়গায় মুসলমানদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে লাখ লাখ ডলার ($) বা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি নিমিষেই ছাই হয়ে যাচ্ছে। বক্তারা এসব অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জোর দাবি জানান।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়েও বক্তারা বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সব রাষ্ট্র ও জনগণকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ওপর এমন বর্বরোচিত সহিংসতা আধুনিক বিশ্বে কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বক্তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা জাতিসংঘ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু কাগুজে বিবৃতি না দিয়ে নির্যাতিত এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সুরক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাবেশ থেকে ভারতের মুসলিমদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সব ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা দ্রুত বন্ধ করা এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ভারত সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের সব প্রান্তের মুসলিম উম্মাহকে যেকোনো বিপদে একে অপরের পাশে থেকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান নেতারা। কর্মসূচির একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্যাতিত মুসলমানদের শান্তি, নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণ কামনা করে এক বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি নিজেদের দেশ ও জাতির শান্তি, সম্প্রীতি এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি কামনা করেও এই মোনাজাতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়
















