প্রথমে বলা হয়েছিল নিরাপত্তার কারণে পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হতেই জানা গেল, তার নামে আগের মামলা থাকায় পুলিশ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করেছে। ঝিনাইদহ শহরে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা তারেক রেজাকে নিয়ে রোববারের এই ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রোববার রাত ঠিক ১০টার দিকে ঝিনাইদহ সদর থানার সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহফুজ হোসেন। একই সঙ্গে তিনি যুবশক্তি নেতা অয়ন রহমানকে গুম করার অভিযোগও পুরোপুরি উড়িয়ে দেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, কেন্দ্রীয় এনসিপি নেতা তারেক রেজার নামে ছাত্রদলের করা একটি মামলা রয়েছে। তিনি সেই মামলার তালিকাভুক্ত আসামি। এরপরেও তিনি রোববার প্রকাশ্যে এসে শহরে একটি সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন সংবাদ সম্মেলন থেকে শহরে আবারও নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে পুলিশ আশঙ্কা করছিল। মূলত শহরে শান্তি বজায় রাখতেই পুলিশ তাকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে। কিন্তু তারেক রেজা যেহেতু একটি চলমান মামলার আসামি এবং তিনি আদালত থেকে কোনো আগাম জামিন নেননি, তাই পুলিশ আইন অনুযায়ী তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ হোসেন আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, সংবাদ সম্মেলনের খবর পেয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারেক রেজাকে মোবাইল ফোনে বারবার সেখানে যেতে নিষেধ করেন। ওসি তাকে পরিষ্কারভাবে বলেন, তিনি যদি সংবাদ সম্মেলন করতে চান, তবে তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিশের নিজস্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। এ জন্য পুলিশকে কিছুটা সময় দিতে হবে। কিন্তু তারেক রেজা পুলিশের কোনো কথাই শোনেননি। তিনি ওসির নিষেধ অমান্য করে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে রওনা হন। তার এই একগুঁয়েমির কারণে সেখানে সংঘাতের নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজনৈতিক সংঘাত বা মারামারি শুরু হলে এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন প্রায় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন। অনেক সময় দোকানপাট প্রায় ১০০% বন্ধ রাখতে হয়। সাধারণ মানুষের এই আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তি এড়াতেই পুলিশ তাকে রাস্তা থেকে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং রাতেই আদালতে সোপর্দ করে।
সাংবাদিকরা এ সময় যুবশক্তি নেতা অয়ন রহমানের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত ২২ মে অয়ন রহমানকে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় যুবশক্তির পক্ষ থেকে একটি গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পুলিশ এই অভিযোগ ১০০% ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল শনিবার রাতে যশোর এলাকা থেকে অয়ন রহমানকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ তাকে লুকিয়ে রাখেনি। বরং গ্রেপ্তারের পরপরই নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ অয়নের পরিবারকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। এরপর দেশের প্রচলিত আইন মেনে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই রোববার বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে।
এনসিপি ও ছাত্রদলের মধ্যকার চলমান সংঘর্ষ ও মামলার বিষয়ে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সাংবাদিকরা সেটিও জানতে চান। জবাবে মাহফুজ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। ইতিমধ্যে ছাত্রদলের ছয়জন নেতা-কর্মী এবং এনসিপির একজন নেতা-কর্মী আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। পুলিশ এ ধরনের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক মামলাগুলোতে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। অকারণে কাউকে হয়রানি করার কোনো ইচ্ছা পুলিশের নেই। পুলিশ দাবি করে, প্রথমদিকে তারেক রেজাকে গ্রেপ্তার করার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না। মূলত অন্য পক্ষের হামলার হাত থেকে তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে আসে। পরে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে গ্রেপ্তার দেখাতে হয়।
শহরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় একজন ব্যক্তির হাতে অস্ত্রসদৃশ একটি বস্তু দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। এই বিষয়ে সাংবাদিকরা পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, পুলিশ ওই ছবি ও ভিডিও নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করছে। অস্ত্রসদৃশ বস্তুটি আসলে কী ছিল এবং সেটি কার হাতে ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে পুলিশ খুব দ্রুত ওই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
রোববার রাতের এই জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পাশে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদউজ্জামান এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ছাব্বিরুল আলম উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের এই ব্যাখ্যার পর শহরের থমথমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত এড়িয়ে চলবে এবং পুলিশও নিরপেক্ষভাবে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে।
















