সাবিনাহীন নতুন দলের নেতৃত্বে মারিয়া মান্দা: সাফে হ্যাটট্রিক শিরোপার খোঁজে বাংলাদেশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কয়েক দিন আগের কথা। দেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও পরিচিত মুখ সাবিনা খাতুনকে এক সাংবাদিক খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল, ‘সাফ নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট কি আপনি মিস করবেন?’ এই প্রশ্নের উত্তরে সাবিনার মুখে একচিলতে ম্লান হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘মিস করার আর কী আছে! তবে মেয়েদের জন্য আমার অনেক অনেক শুভকামনা থাকল। ওরা যেন এবারও হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরতে পারে।’ সাবিনার এই সুন্দর প্রত্যাশা এখন দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষের। কিন্তু সাবিনার মনে গভীর এক আক্ষেপ না থেকে পারেই না। কারণ, তাঁর দুর্দান্ত নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ২০২২ এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেরা মুকুট জিতেছিল। অথচ এবারের আসরে তিনি নিজেই দলে নেই। শুধু সাবিনা নন, তাঁর সঙ্গে দলে জায়গা পাননি মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণা রানী সরকার এবং সানজিদার মতো অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও পরিচিত তারকারা।

২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দলের ভেতরে চরম দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। দলের কিছু সিনিয়র খেলোয়াড় ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের অধীনে খেলতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। কোচ এবং খেলোয়াড়দের এই দ্বন্দ্বের চরম মূল্য দিতে হয় সাবিনাদের। দল থেকে তাঁরা সরাসরি বাদ পড়েন। তবে সাবিনারা না থাকলেও এবারের দলে গত দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন দলের মূল নিউক্লিয়াসরা ঠিকই আছেন। ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, তহুরা এবং শামসুন্নাহাররা দলের হাল ধরেছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছে একঝাঁক তরুণ ও প্রতিভাবান নতুন মুখ। এই পুরোনো ও নতুনের মিশেলে গড়া দল নিয়েই বাংলাদেশ এবার শিরোপা ধরে রাখার কঠিন মিশনে ভারতে পা রেখেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন গতকাল রোববার ভারতের গোয়ায় এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় চমক অপেক্ষা করছিল। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে আফঈদা খন্দকারের আসার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর বদলে সেখানে হাজির হন দলের নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আফঈদা খন্দকার অধিনায়কের মতো এমন বড় একটি পদের চাপ ঠিকমতো নিতে পারছেন না। অতিরিক্ত চাপের কারণে তাঁর নিজের পারফরম্যান্সও প্রত্যাশিত মানের হচ্ছে না। তাই দলের সার্বিক স্বার্থের কথা চিন্তা করে আফঈদাকে সরিয়ে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ মারিয়া মান্দাকে। মারিয়া গত দুটি সাফজয়ী দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।

নতুন অধিনায়ক মারিয়া মান্দার চোখ এখন সরাসরি হ্যাটট্রিক শিরোপার দিকে। সংবাদ সম্মেলনেও তিনি শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটাই বারবার সবার সামনে তুলে ধরেছেন। মারিয়া অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, এটা সত্যি। কিন্তু সেটা এখন আমাদের অতীত। আমাদের এখন সবকিছু একেবারে নতুন করে শুরু করতে হবে। এটা আমাদের জন্য পুরো নতুন একটা চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা এই চ্যালেঞ্জ নিতে পুরোপুরি তৈরি।’ মেয়েদের ফুটবলে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থের জোগান দিচ্ছে বিভিন্ন স্পনসর। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও নারী ফুটবলের পেছনে বাজেট অন্তত ৩০% বাড়িয়েছে। এবার টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে মেয়েরা হয়তো দলগতভাবে ৫০,০০০$ (পঞ্চাশ হাজার ডলার) বা তারও বেশি বড় আর্থিক পুরস্কার পাবেন। তাই খেলোয়াড়রা মাঠের খেলায় নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিতে প্রস্তুত।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

টুর্নামেন্টের অন্য দলগুলোও বেশ ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। আজ প্রথম দিনে বাংলাদেশ সময় ঠিক বিকেল পাঁচটায় ভুটান ও নেপাল মাঠে নামবে। এরপর রাত আটটায় স্বাগতিক ভারত খেলবে মালদ্বীপের বিপক্ষে। বাংলাদেশের মেয়েরা আগামী ২৮ মে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের মুখোমুখি হবে। রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান এবার টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে না। তাই এবারের শিরোপার মূল দাবিদার ধরা হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালকে। নেপালের মেয়েদের জন্য এই টুর্নামেন্টটি এক বিশাল আক্ষেপের নাম। গত সাতটি টুর্নামেন্টের মধ্যে ছয়বারই তারা ফাইনালে খেলেছে এবং প্রতিবারই হেরে রানার্সআপ হয়েছে। তাই এবার নেপাল যেকোনো মূল্যে ট্রফি জিততে মরিয়া হয়ে লড়বে। অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের প্রথম পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত। এবার ভারতের মাটিতেই খেলা হচ্ছে। তাই নিজেদের মাঠে ভারতের সমর্থন ও চেনা পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য এবারের মিশনকে অনেকটাই কঠিন করে তুলবে।

বাংলাদেশ দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার প্রতিপক্ষের এই শক্তির কথা খুব ভালো করেই জানেন। তবে তিনি তাঁর দলের সাম্প্রতিক এশিয়ান কাপে খেলার অভিজ্ঞতাটাকে সাফে কাজে লাগাতে চান। বাটলার বলেন, ‘ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমাদের দেশের মেয়েরা এশিয়ান কাপের সিনিয়র ও অনূর্ধ্ব-২০ স্তরে খেলেছে। সিনিয়র দল শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে খুব দারুণ ফুটবল খেলেছে। ওই দুটি টুর্নামেন্ট থেকে আমরা বেশ ভালো কিছু শিক্ষা পেয়েছি। তবে সাফ একেবারে আলাদা ধাঁচের একটি টুর্নামেন্ট। এখানে আমাদের সামনে বেশ বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আমরা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়ে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হতে চাই।’

টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ৬টি দলের কোচ ও অধিনায়কদের নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাগতিক ভারতের কোচ ক্রিসপিন ছেত্রী নিজেদের হারানো শিরোপা পুনরুদ্ধারের কথাই বারবার বলেছেন। ক্রিসপিন ছেত্রী বলেন, ‘সবাই এখানে জিততে চায়, আমরাও চ্যাম্পিয়ন হতে চাই।’ অন্যদিকে নেপালের কোচ নবীন নিউপানের কণ্ঠে ছিল ট্রফি ছোঁয়ার তীব্র আকুতি। তিনি বলেন, ‘গত দুটি ফাইনালেই আমরা বাংলাদেশের কাছে হেরে শিরোপা খুইয়েছি। ছয়বার ফাইনালে উঠলেও এখন পর্যন্ত আমাদের ভাগ্য সহায় হয়নি। এবার আমরা সেই আক্ষেপ ঘোচাতে চাই।’ লঙ্কান কোচ দীপানি সামারাসিংহে ভারত আর বাংলাদেশকে বেশ সমীহ করছেন। আবার ভুটানের কোচ কিম তাই-ইন জানিয়েছেন, নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁর দল আগের চেয়ে অনেক উন্নতি করছে। এখন শুধু মাঠের সবুজ ঘাসে আসল লড়াই দেখার অপেক্ষা।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ