জেন-জি প্রজন্মের নতুন বিদ্রোহ: ভারতে অনলাইনে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামছে রাজপথে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বেকারত্ব ও সীমাহীন ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া একটি ভিন্নধর্মী আন্দোলন এখন ভারতের রাজপথ কাঁপাচ্ছে। নাম তার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। অনলাইনে শুরু হওয়া জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলন এখন আর শুধু মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের মধ্যে আটকে নেই। নিজেদের ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়ে একদল তরুণ রীতিমতো তেলাপোকার পোশাক পরে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। তাদের এই অভিনব প্রতিবাদ নজর কাড়ছে পুরো বিশ্বের। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে তরুণদের সাম্প্রতিক তুমুল সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর ভারতের এই নতুন ছাত্র-যুব আন্দোলন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তরুণরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তারা আর চুপ করে থাকবেন না।

সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো এই দলটির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট গত বৃহস্পতিবার ভারতে স্থগিত করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানান, স্থগিত হওয়ার আগে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নন তারা। অ্যাকাউন্ট স্থগিতের মাত্র দুই ঘণ্টা পরই ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে তারা এক্সে ফিরে আসেন। ফিরে এসেই তারা সমালোচকদের উপহাস করে নতুন পোস্ট করেন। একটি পোস্টে তারা লেখেন, “আপনারা ভেবেছিলেন, আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবেন? হাঁ হাঁ।” অন্য একটি পোস্টে বিজেপির ইনস্টাগ্রাম এবং সিজেপির মূল অ্যাকাউন্টের অনুসারী সংখ্যার তুলনামূলক স্ক্রিনশট শেয়ার করে তারা ক্যাপশন দেন, “যে কারণে তারা আমাদের ব্লক করেছে।”

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সত্যিই সিজেপি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে বিজেপির অনুসারী ৮৮ লাখ এবং কংগ্রেসের ১ কোটি ৩৩ লাখ। আর সেখানে সিজেপি ১ কোটি ৪০ লাখ অনুসারীর বিশাল মাইলফলক পার করে ফেলেছে। এত কম সময়ে এমন জনপ্রিয়তা এক কথায় অভাবনীয়।

এমন অদ্ভুত নামের পেছনের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। গত সপ্তাহে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একটি শুনানির সময় বেকার তরুণ ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন। যদিও পরে তিনি দাবি করেন যে তার বক্তব্য ভুলভাবে ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। সেই ক্ষোভ থেকেই ব্যঙ্গ করে তারা নিজেদের দলটির নাম রাখেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। তারা ঘোষণা দেন, রাষ্ট্রযন্ত্র যাদের কথা গুনতে ভুলে গেছে, এই দল তাদেরই কণ্ঠস্বর।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সিজেপি ভারতের সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষায় কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। তারা মূলত একটি ৫ দফা ইশতেহার নিয়ে মাঠে নেমেছে, যা প্রচলিত রাজনীতিকে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সিজেপি ক্ষমতায় এলে অবসরের পর কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে রাজ্যসভার আসন দেওয়া হবে না। এ ছাড়া সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এবং দল পাল্টানো এমপি-বিধায়কদের জন্য ২০ বছর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন তারা। এমনকি বৈধ ভোট মুছে ফেলার প্রমাণ পেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কঠোর ইউএপিএ আইনে গ্রেপ্তার এবং আদানি-আম্বানির মতো ধনকুবেরদের মালিকানাধীন মিডিয়া হাউসের লাইসেন্স বাতিলের মতো অত্যন্ত সাহসী দাবিও রয়েছে তাদের ইশতেহারে।

এই পুরো আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হলেন ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দিপকে। পুনে থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা এই তরুণ গত ১৬ মে এই অনলাইন প্রচারণা শুরু করেন। এর আগে তিনি ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া টিমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। সিজেপিতে যোগ দেওয়ার শর্তগুলো তারা খুব মজার ছলে সাজিয়েছেন। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দলে আসতে হলে একজন মানুষকে অবশ্যই বেকার ও অলস হতে হবে, অনলাইনে প্রচুর সময় কাটাতে হবে এবং পেশাদারভাবে নিজের ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে। মূলত মিম, অ্যানিমেশন ও গ্রাফিকস ব্যবহার করে তারা প্রশ্নফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা ও বেকারত্বের মতো গুরুতর সমস্যাগুলো তুলে ধরছেন।

অভিজিৎ দিপকে দাবি করেন, বাস্তব কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তিনি মনে করেন, এটি দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণদের জেগে ওঠার একটি বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ। ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি তরুণ। কিন্তু তারা সবাই তীব্র চাকরিসংকট, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, ধর্মীয় বিভাজন ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মতো অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট। ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের ওপর তরুণদের এই বিশাল ক্ষোভেরই প্রতিফলন এই ককরোচ জনতা পার্টি। সমালোচকরা একে বিরোধীদের অনলাইন কৌশল বলে উড়িয়ে দিলেও, অভিজিৎ দৃঢ়তার সাথে জানান, এই আন্দোলন আর শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার ধরন বদলে দেবে এবং প্রয়োজনে অধিকার আদায়ে মাঠেও গড়াবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ