ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভা: মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে প্রশাসনের কঠোর বার্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সামাজিক অপরাধ দমনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদের কনফারেন্স রুমে এই বিশেষ সভার আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন। মূলত সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মনে পূর্ণ স্বস্তি ফেরাতেই এই সময়োপযোগী সভার ডাক দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কোটচাঁদপুর উপজেলার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার। নতুন ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এটি ছিল তার অন্যতম একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় সভা।

প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের বিপুল উপস্থিতিতে সভাটি বেশ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে ওঠে। সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেল রানা এবং কোটচাঁদপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনছারুল ইসলাম। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম এবং কোটচাঁদপুরের সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি এস কে এম সালাহউদ্দিন বুলবুল সিডল। এছাড়াও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল মান্নান, স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সভার মূল আলোচনার বিষয় ছিল নির্বাচন পরবর্তী সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সমাজে চলমান নানা সমস্যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান। বক্তারা অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে নিজ নিজ এলাকার বর্তমান অবস্থা সবার সামনে তুলে ধরেন। বিশেষ করে শহরের পাড়া-মহল্লা ও গ্রামের মোড়ে মোড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, স্কুলগামী মেয়েদের ইভটিজিং এবং গোপনে বাল্যবিবাহ দেওয়ার মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপস্থিত সবাই। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সমাজে যদি অপরাধের মাত্রা মাত্র ১০% থেকে ১৫% বৃদ্ধি পায়, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ওই এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর। তাই আগামী দিনে এসব অপরাধ অত্যন্ত শক্ত হাতে দমন করে সামাজিক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তা শতভাগ (১০০%) নিশ্চিত করার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বর্তমান সময়ে তরুণ ও যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাদকের সহজলভ্যতা। সভায় উপস্থিত প্রায় সব বক্তাই মাদকের এই ভয়াবহতা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানান, মাদক পাচার ও সেবনের কারণে কোটচাঁদপুরের অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ ও তাদের পরিবার একেবারে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একটি সাধারণ হিসাবে দেখা যায়, প্রতি বছর শুধু মাদক কেনাবেচার পেছনেই কালোবাজারে হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। মাদকের টাকার জোগান দিতে গিয়ে সমাজে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধগুলো শুধু পুলিশ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শুধু প্রশাসন বা পুলিশের ওপর নির্ভর না করে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সাধারণ জনগণকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখার জোরালো আহ্বান জানানো হয় এই সভায়। নবাগত ইউএনও দীপা রানী সরকার তার বক্তব্যে বলেন, প্রশাসন সব সময় সাধারণ জনগণের পাশে আছে। কিন্তু সামাজিক অপরাধগুলো একেবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে হলে স্থানীয় নেতাদের সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতারা যদি অপরাধীদের কোনো প্রকার রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করেন এবং প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিয়ে নিয়মিত সহায়তা করেন, তবে সমাজ থেকে অপরাধের মাত্রা অন্তত ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত খুব সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। পুলিশ পরিদর্শক আনছারুল ইসলামও জানান, পুলিশের টহল আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে এবং তারা যেকোনো অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।

সামাজিক অপরাধ দমনে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকার কথাও এই সভায় বিশেষভাবে উঠে আসে। মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতদের অনুরোধ করা হয়, তারা যেন তাদের বয়ান ও প্রার্থনার সময় সাধারণ মানুষকে মাদকের কুফল এবং বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন করেন। বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের শুধু শারীরিক ক্ষতিই করে না, বরং তার পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। শিক্ষকরাও স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার ওপর আরও বেশি জোর দেবেন বলে সভায় প্রতিশ্রুতি দেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বাজারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে তবেই ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে। চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ভয়ে যেন কোনো ব্যবসায়ীকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়, সেদিকে প্রশাসনের কড়া নজরদারি দাবি করেন তারা।

সভার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে নারী নির্যাতন রোধ এবং কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উপজেলা প্রশাসন। গ্রামের সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করতে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক, পথসভা ও মাইকিং করার প্রস্তাব দেন উপস্থিত ইউপি চেয়ারম্যানরা। দলমত নির্বিশেষে সভার সবাই একমত হন যে, কোটচাঁদপুরকে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে তারা এখন থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাবেন। রাজনৈতিক ভেদাভেদ পুরোপুরি ভুলে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সবাই একসাথে কাজ করার যে দৃঢ় প্রত্যয় এই সভায় ব্যক্ত করেছেন, তা নিঃসন্দেহে কোটচাঁদপুরের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে গভীর আশার সঞ্চার করেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ