দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. খুরশীদ আলম। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। গতকাল রোববার, ২৪ মে রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগের পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করে।
এ বিষয়ে প্রথম আলোকে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মো. খুরশীদ আলম জানান, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফোন পাওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার চিঠি পেয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, আগের সরকার পরিবর্তনের পর কিছু বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তার ‘মব জাস্টিস’ বা গণরোষের কারণে তাকে ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায়, সরকার তাকে দেশের একটি বৃহৎ ব্যাংকের এত বড় দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।
খুরশীদ আলমের ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর এবং এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ এই চাকরি জীবনে তিনি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ এবং কৃষিঋণ বিভাগসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী খুরশীদ আলমের এই অভিজ্ঞতা ইসলামী ব্যাংককে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, গতকাল রোববারই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান। তিনি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা দ্রুত গ্রহণ করে নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করা হয়। এম জুবায়দুর রহমান ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর গভর্নর থাকাকালীন ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং পরে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তবে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান যোগদানের পর ইসলামী ব্যাংকের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের মতবিরোধ দেখা দেয়[4]। এই টানাপোড়েনের মাঝেই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অনলাইনে পর্ষদ সভায় উপস্থিত থাকার শর্ত দিয়ে দীর্ঘ দেড় মাসের ছুটিতে দেশের বাইরে চলে যান। একই সময়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকেও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। গত ১২ এপ্রিল ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় তাদের এই ছুটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল।
রোববার ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি পর্ষদ সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল থেকেই ব্যাংকের গ্রাহক ও কিছু কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয়ের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভকারীরা এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগ না করার দাবি জানান এবং একই সাথে চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেন। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখেই জুবায়দুর রহমান তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। ব্যাংকটির একটি সূত্র জানিয়েছে, ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানও তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তবে পর্ষদ সভাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়ায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দেশের অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা অনেক বড়। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এর আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সরিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে এসে মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায় নেমে গেছে। সে সময় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ৪.২৫%, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯%। বর্তমানে ব্যাংকটির প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি অবস্থায় আছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয়।
















