কিয়েভে রাশিয়ার স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা: প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে ইউক্রেন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাশিয়ার দখল করা পূর্ব ইউক্রেনে ড্রোন হামলার চরম প্রতিশোধ নিল ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রীতিমতো নরক নামিয়ে এনেছে রুশ বাহিনী। রোববার ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নজিরবিহীন ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। এই নির্মম হামলায় দুই ফুটফুটে শিশুসহ অন্তত চারজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সঙ্গে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন চার শতাধিক মানুষ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, এই হামলায় রাশিয়া তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেসনিক’ ব্যবহার করেছে।

ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত হামলায় রাশিয়া মোট ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। আকাশ, সমুদ্র ও স্থলভাগতিন দিক থেকেই তারা এই বিপুল পরিমাণ মরণাস্ত্র ছোড়ে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এক রাতের এই বিশাল হামলায় রাশিয়ার কয়েক শ মিলিয়ন $ (ডলার) খরচ হয়েছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অবশ্য বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তারা প্রায় ৯১% ড্রোন, অর্থাৎ ৫৪৯টি ড্রোন এবং ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস বা জ্যাম করে দেয়। তবে বাকিগুলো ঠিকই বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং অন্তত ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। যুদ্ধের কারণে এমনিতেই ইউক্রেনের অর্থনীতি ধুঁকছে, তার ওপর এমন ধ্বংসযজ্ঞ তাদের বিপদ আরও বাড়াল।

রাজধানী কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, শুধু কিয়েভ শহরেই দুজন নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন। শহরের প্রতিটি জেলাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখানে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। একটি বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্রে হামলার কারণে বহু মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েন। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে শহরের কেন্দ্রস্থল ও সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি থাকা শক্ত ভবনগুলোও থরথর করে কেঁপে ওঠে। বহু মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচাতে পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন। কিয়েভের পাশাপাশি চেরকাসি অঞ্চলে ১১ জন এবং দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে ৭ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া মধ্য ইউক্রেনের বিলা তেরকভা শহরে তাদের অত্যাধুনিক ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরাসরি আঘাত হেনেছে। তিনটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ কেন্দ্রে পড়ে। এতে একটি পুরো বাজার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং ডজনখানেক আবাসিক ভবন ও সাধারণ স্কুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি বলেন, ওরা আসলেই উন্মাদ হয়ে গেছে। ইউক্রেনের বুকে রাশিয়ার এই ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি একে আন্তর্জাতিক নিয়মের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেশ অহংকার নিয়েই এই অস্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ওরেসনিক শব্দের অর্থ হলো ‘হেজেলনাটগাছ’ বা একধরনের বাদামগাছ। এই ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। এটি মাটির নিচে তিন থেকে চার তলা গভীর বাংকার মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করতে সক্ষম। পুতিন আরও বলেন, অস্ত্রটি একেবারে উল্কাপিণ্ডের মতো আকাশ থেকে ছুটে আসে এবং বিশ্বের যেকোনো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুব সহজেই ফাঁকি দিতে পারে। এমনকি সাধারণ বোমা যুক্ত করলেও এই ধরনের কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত পারমাণবিক হামলার মতোই ১০০% বিধ্বংসী হতে পারে। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও রাশিয়া এই অস্ত্র ব্যবহার করেছিল।

রাশিয়ার এই উন্মত্ততার পেছনে রয়েছে প্রতিশোধের আগুন। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্ব ইউক্রেনের স্টারোবিলস্ক শহরের একটি কলেজের ছাত্রাবাসে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। মস্কোর দাবি, ওই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৪২ জন আহত হন। হতাহতদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণী। এই ঘটনার পরপরই রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, এর জন্য দায়ীদের অনিবার্য ও কঠোর শাস্তি পেতে হবে। এই চরম পরিণতির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও কিয়েভে বড় ধরনের হামলার সতর্কতা জারি করেছিল। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া প্রতিদিনই হামলা করছে, তবে রোববারের এই রাতকে স্থানীয়রা যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হামলার শিকার সাধারণ মানুষের চোখেমুখে এখন কেবলই হতাশা আর আতঙ্ক। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, আবাসিক ভবনসহ রাজধানীর ৪০টি স্থানে ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি বাজারে গত ২২ বছর ধরে কাজ করতেন ৫৫ বছর বয়সী নারী সভেতলানা ওনোফ্রিচুক। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, এটি ছিল এক ভয়ানক রাত। পুরো যুদ্ধের সময়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি আর কখনো দেখেননি। খুব দুঃখের সঙ্গে কিয়েভ ছাড়ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে আর থাকার কোনো উপায় নেই, আমার কাজ শেষ, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ৭৪ বছর বয়সী ইয়েভহেন জোসিন বলেন, বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কায় আমরা ছিটকে পড়ি। ভাগ্যক্রমে আমরা বেঁচে গেছি, কিন্তু আমার সাজানো অ্যাপার্টমেন্টটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ভয়াবহ যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনের শতভাগ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ