শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন কিশোর আলোর (কিআ) ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে বসেছিল এক বিশাল মিলনমেলা। রোববারের সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকার গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। ‘সেপনিল নিবেদিত কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬’ নামের এই উৎসবে শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকেরা দারুণ আনন্দে দিন কাটান। দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং সমানসংখ্যক অভিভাবক এই আয়োজনে যোগ দেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবে রূপ নেয়। এই আয়োজনে সহযোগিতা করেছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, গোল্ড পার্টনার ছিল মাইটি চিপস। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। বিদেশের মাটিতে এমন বড় মাপের একটি ইভেন্ট আয়োজন করতে স্পনসরদের হাজার হাজার ডলার ($) খরচ করতে হয়, কিন্তু আমাদের দেশে সবার ভালোবাসায় উৎসবটি দারুণ সফল হয়েছে।
সকাল ঠিক ৯টায় সবাই মিলে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সুরবিহার ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড পারফরম্যান্স সেন্টারের শিল্পীরা ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানটি পরিবেশন করেন। উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরাও পরম মমতায় তাদের সঙ্গে গলা মেলান। কনভেনশন সেন্টারের নিচতলার বলরুমে মূল অনুষ্ঠান চললেও পুরো ভবন জুড়েই ছিল নানা আয়োজন। দোতলায় অভিনয়, ছবি তোলা, মানসিক স্বাস্থ্য, গণিত ও প্রযুক্তি নিয়ে চমৎকার সব কর্মশালা হয়। গ্রিনহাউস মঞ্চে শিশুরা মেতে ওঠে ছবি আঁকা আর কার্টুন তৈরির আনন্দে। আর বাইরের চত্বরে প্রথমা প্রকাশনসহ বিভিন্ন স্টল থেকে বই ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।
কার্নিভ্যালের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিতে সেখানে উপস্থিত হন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি ছোটদের নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, শুধু বই পড়লেই হবে না; খেলাধুলা, সাঁতার ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে মানুষকে ১০০ ভাগ পূর্ণতা পেতে হয়। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পথে না হেঁটে নিজের মনের কথা শোনার ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি আরও বলেন, মানুষ শুধু পাওয়ার মধ্যে বড় হয় না, অন্যকে দেওয়ার মাধ্যমেও মহত্ত্ব অর্জন করে। তাই নিজের উপার্জনের অন্তত ৫% বা ১০% অন্যের কল্যাণে ব্যয় করার মানসিকতা গড়ে তোলার কথা মনে করিয়ে দেন তিনি।
শিশু-কিশোরদের নিজস্ব স্টাইল তৈরির কথা বলেন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব। তিনি জানান, সবার আঁকার মধ্যেই আলাদা সৌন্দর্য থাকে, কেউ খারাপ আঁকে না। ছবি তোলার সহজ নিয়মকানুন শিখিয়ে দেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। এরপর টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক পড়াশোনাকে কীভাবে আরও সহজ ও মজাদার করা যায়, সেই কৌশলগুলো শিখিয়ে দেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বি এম মইনুল হোসেন। এখনকার সময়ে ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার জন্য সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ ক্লাস নেন পুলিশ কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। এর ফাঁকে রাজীব বসাকের জাদুর খেলা আর জলপুতুলের পাপেট শো শিশুদের আনন্দে মাতিয়ে রাখে।
সকালের উদ্বোধনী পর্বে কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হক অভিভাবকদের উদ্দেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বাবা-মায়ের স্বপ্নের চেয়ে শিশুর নিজের আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যার ভেতরে একজন শেক্সপিয়ার লুকিয়ে আছে, তাকে আমরা জোর করে ব্যাংকার বানাতে চাই। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বই পড়ার মাধ্যমে শিশুদের কল্পনার জগৎ যতটা বাড়ে, স্ক্রিনে ভিডিও দেখলে তা হয় না। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যেভাবে স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে, তা থেকে বের করে আনতে এমন আয়োজন দারুণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সময় অন্তত ৫০ থেকে ৬০% কমিয়ে এনে বইয়ের দিকে মনোযোগী করা উচিত।
বিনোদনজগতের জনপ্রিয় তারকারাও এই উৎসবের মঞ্চ আলো করেন। জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী শিশুদের বলেন, জীবনে যে কাজই করতে চাও না কেন, সফল হতে হলে নিয়মিত চেষ্টা ও পরিশ্রম করতে হবে। অভিনেতা আফরান নিশো আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতার ওপর জোর দিয়ে নিজের জীবনের গল্প শোনান। আরেক অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব আবেগপ্রবণ হয়ে তাঁর মায়ের স্মৃতিচারণা করেন। তারকারা শিশুদের নানা মজার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের মন জয় করে নেন।
দুপুরের খাবারের পর পাঠকেরা কিশোর আলো সম্পাদকের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। আনিসুল হক ও জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক আহমাদ মুদ্দাসসের হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর শুরু হয় জমজমাট গানের আসর। আহমেদ হাসান সানি, জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল ও তাঁর দল এবং বিখ্যাত ব্যান্ড অ্যাভয়েড রাফা গান গেয়ে পুরো মিলনায়তন মাতিয়ে তোলে। ব্যান্ড ওয়ারফেজের ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপুও নিজের সংগীতজীবনের গল্প শোনান। দিনভর হইচই, আড্ডা আর গানের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হয় এই আনন্দঘন কার্নিভ্যাল।
















