চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় বৃহস্পতিবার এক অভূতপূর্ব ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চার বছর বয়সী এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে বিকেল চারটার দিকে পুলিশ আটক করে। কিন্তু এই অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে যেতে পুলিশকে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়। ক্ষুব্ধ জনতা আসামিকে নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার দাবিতে পুলিশকে টানা ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়েও পুলিশ জনতাকে দমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত রাত সোয়া দশটার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পুলিশ কৌশলে ওই ব্যক্তিকে সরিয়ে নেয়।
ঘটনার শুরু বিকেল চারটায়। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ধরে ফেলে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আসামিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। কিন্তু উপস্থিত জনতা কোনোভাবেই আসামিকে পুলিশের গাড়িতে উঠতে দিচ্ছিল না। তাদের দাবি ছিল একটাই—ধর্ষককে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে, তারা নিজেরাই এর বিচার করবে। আমাদের দেশে আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষের মনে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধর্ষণ বা এ জাতীয় গুরুতর মামলার প্রায় ৯০% ক্ষেত্রেই বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এই অবিশ্বাসের কারণেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চেয়েছিল।
জনতার ভিড় বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। বিক্ষোভকারীরা চারপাশ থেকে পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলে এবং প্রবল স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের অন্যান্য থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। রাত আটটার দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের হটাতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। কিন্তু এতে জনতা ভয় পাওয়ার বদলে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে এবং ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এই তুমুল সংঘর্ষের মধ্যে ক্ষুব্ধ মানুষ পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের করের টাকায় কেনা এই গাড়ি পোড়ানোয় রাষ্ট্রের বড় আর্থিক ক্ষতি হলো।
মাঠপর্যায়ে এই খণ্ডযুদ্ধের মাঝেই ঘটনার শিকার শিশুটির স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশুটির এক আত্মীয় চরম ক্ষোভের সঙ্গে জানান, তারা কোনোভাবেই আসামিকে পুলিশের হাতে দিতে চান না। তারা সরাসরি ওই ধর্ষকের ফাঁসি চান। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভের পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল একটি ভিডিও। বিকেলে আটকের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় মনির হোসেন নিজের মুখে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টার কথা স্বীকার করছে। এই ভিডিওটি মানুষের রাগকে ১০০% বাড়িয়ে দেয় এবং তারা আসামির ওপর আরও মারমুখী হয়ে ওঠে।
রাত সোয়া ১০টার দিকে হঠাৎ করেই পুরো চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে পড়ে। পুলিশ এই অপ্রত্যাশিত সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগায়। তারা অত্যন্ত কৌশলে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ওই অন্ধকার ভবনের ভেতর থেকে বের করে দ্রুত নিজেদের হেফাজতে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। তবে পুলিশ চলে যাওয়ার পরও উত্তেজিত লোকজন রাস্তা ছাড়েনি। তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং আগুন ধরিয়ে মাঝরাত পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। তাদের একটাই ভয়, মামলা হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছুদিন পর ঠিকই আইনি ফাঁকফোকর গলে জামিনে বেরিয়ে আসবে এবং বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করায় পুলিশ আত্মরক্ষার জন্যই টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ব্যবহার করেছে। এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগে পুলিশ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আসামিকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তবে আসামির জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে, তা পুলিশ গোপন রেখেছে।
পুলিশ বারবার সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করছে তারা যেন কোনোভাবেই আইন নিজেদের হাতে তুলে না নেন। অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। সমাজে শান্তি ফেরাতে হলে পুলিশের ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকেও আরও দ্রুতগতি সম্পন্ন করতে হবে।
















