রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার রাতে বেইজিংয়ে পৌঁছান। তাঁর এই সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা হবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণোৎসবে যোগ দেওয়া। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বুধবার সকালে সি চিন পিং ও পুতিনের মধ্যকার বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। এই সফরের সময়কালও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
পুতিনের এই সফরের ঠিক আগেই, গত সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার মাত্র চার দিন পরই পুতিন চীনে পা রাখলেন। বিশ্লেষকদের মতে, পরপর এই দুই পরাশক্তির নেতার বেইজিং সফর প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক কূটনীতিতে চীন এখন একটি কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ট্রাম্পের সফর ও অমীমাংসিত ইস্যু
ট্রাম্প তাঁর চীন সফরে বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির কথা ফলাও করে প্রচার করলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোয় কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তাইওয়ান ইস্যু এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েই গেছে। এই প্রেক্ষাপটে পুতিনের সফরটি রাশিয়ার জন্য বেশ সুবিধাজনক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাম্পের ‘বেপরোয়া’ পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সি ও পুতিনকে আরও কাছাকাছি এনেছে।
পুতিনের কৌশলগত সুবিধা
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন বিষয়ের গবেষক মেরিনা মিরন মনে করেন, এই সফর থেকে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বরং এটি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার একটি ধারাবাহিকতা। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান আরও গভীর হবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক মূলত কৌশলগত এবং স্থিতিশীল।
দুই দেশ যৌথ প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে জ্বালানি খাতের কাজগুলো এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন সস্তায় রাশিয়ার জ্বালানি পেতে চায়, অন্যদিকে রাশিয়া ড্রোন উৎপাদনের জন্য চীনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
চীনের ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’র ভূমিকা
পরপর ট্রাম্প ও পুতিনের সফর চীনের কূটনৈতিক শক্তিকেই তুলে ধরেছে। গবেষক মেরিনা মিরন বলেন, চীন নিজেকে একটি ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ এবং অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। যদিও চীন রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অংশীদার, তবুও প্রকাশ্যে তারা কোনো পরাশক্তির পক্ষ না নেওয়ার ভান করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব রাশিয়ার চেয়ে চীনের অর্থনীতিতে বেশি পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে রাশিয়া স্বল্প মেয়াদে লাভবান হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও ভবিষ্যৎ
পুতিন হয়তো চীনের কাছ থেকে আরও সামরিক সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। চ্যাথাম হাউসের ফেলো টিমোথি অ্যাশ বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন একটি ছোট ও নির্ভরশীল অংশীদারে পরিণত হয়েছে। সব চাবিকাঠি এখন চীনের হাতে। ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হলেও চীন মস্কোকে নির্দিষ্ট কোনো সমাধানের জন্য চাপ দেবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
শেষ পর্যন্ত, এই সফর থেকে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য না এলেও, এটি স্পষ্ট যে বিভক্ত বিশ্বব্যবস্থায় চীন নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। একদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এবং এর ঠিক পরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে আতিথেয়তা দিয়ে বেইজিং বুঝিয়ে দিল, বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
















