বর্তমান আধুনিক যুগে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইসগুলো আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের আগামী প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কত বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে এখন ঘরে ঘরে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। অনেক অভিভাবকই মনে করেন, তার সন্তান হয়তো একাই এই সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা কাটায় এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্রের স্ক্রিনে বা পর্দায় চোখ রেখে, যা তাদের সুস্থ বিকাশের পথে এক বিশাল বাধা।
এই গবেষণার ফলাফল গত ৪ মে ২০২৬ তারিখে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। আইসিডিডিআরবির পাঁচজন অভিজ্ঞ গবেষক এবং ঢাকার টেলি সাইকিয়াট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্কের একজন গবেষক টানা দুই বছর ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মোট ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর এই নিবিড় জরিপ চালানো হয়। গবেষণায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের সমানসংখ্যক স্কুল থেকে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হয়, যারা মূলত দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী। তবে গবেষণার নিখুঁত ফলাফলের স্বার্থে আগে থেকেই বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা শিশুদের এই জরিপের বাইরে রাখা হয়েছিল।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন অর্থাৎ প্রায় ৮৩% শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে। বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুই ঘণ্টার স্বাস্থ্যকর সীমাকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, এই শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময় শুধু স্ক্রিন দেখেই পার করে দিচ্ছে। অতিরিক্ত এই স্ক্রিন টাইমের সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে শিশুদের অতি প্রয়োজনীয় ঘুমের ওপর। বয়ঃসন্ধিকালের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য এই বয়সের শিশুদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের গড় ঘুমের সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, শৈশবের এই দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব শিশুদের স্মৃতিশক্তি, পড়াশোনায় মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক শারীরিক বৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
শারীরিক সমস্যাও কম নয়। গবেষণার তথ্য বলছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু এরই মধ্যে চোখের নানা সমস্যায় ভুগছে এবং অবাক করার মতো বিষয় হলো, ৮০% শিশু প্রায়ই মাথাব্যথা হওয়ার অভিযোগ করেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার কারণে শারীরিক পরিশ্রম একেবারে কমে যাচ্ছে। ফলে প্রায় ১৪% শিশু এখন অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার, আর যারা স্ক্রিনে বেশি সময় কাটায়, তাদের মধ্যে এই হার আরও আশঙ্কাজনক। শারীরিক এই সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও চরম ঝুঁকির মুখে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা নানা আচরণগত মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুরা তাদের আশপাশের মানুষের সাথে সরাসরি মেলামেশা বা খেলাধুলা করা কমিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের মন-মেজাজ এবং অনুভূতিকে খিটখিটে করে তুলছে।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী শাহরিয়া হাফিজ কাকন এই বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে মা-বাবার কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।” তিনি আরও জানান, কোভিডের সময় অনলাইন ক্লাস করার জন্য শিশুদের হাতে যে মোবাইল তুলে দেওয়া হয়েছিল, স্কুল খোলার পরও সেই আসক্তি কাটেনি। এছাড়া শহুরে জীবনে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব এবং অনেক মা-বাবার নিজেদেরই চার-পাঁচ ঘণ্টার স্ক্রিন টাইম শিশুদের এই পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই নীরব মহামারি থেকে রক্ষা পেতে বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী শিশুদের স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি। শিশুদের চোখের সুরক্ষার জন্য ‘২০-২০-২০’ নিয়মটি মেনে চলা যেতে পারে, অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের বিতর্ক প্রতিযোগিতা, দলবদ্ধ পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং বাগান করার মতো সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা স্ক্রিনের মোহ থেকে বেরিয়ে একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবন গড়তে পারে।
















