লেবাননে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমানো সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়ংকর দুঃসংবাদ এল লেবানন থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে চলমান সংঘাতের জেরে ইসরায়েলের চালানো এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধা বাংলাদেশি। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত নাবাতিয়ের যেব্দিন এলাকার একটি আবাসস্থলে এই নিষ্ঠুর হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ড্রোন থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ছোড়া বোমার আঘাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ওই দুই কর্মী। নিহত দুই প্রবাসীরই গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায়। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তারা সেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস গভীর রাতে এই দুই কর্মীর মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। লেবাননে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, নিহত দুই বাংলাদেশির মৃতদেহ বর্তমানে নাবাতিয়ের নাবিহ বেররি হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাস নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানায়। একই সঙ্গে মৃতদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত বেশ কয়েক মাস ধরেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছে। আকাশপথে প্রায় প্রতিদিনই অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বোমা ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে বসবাসরত সাধারণ মানুষ চরম বিপদের মধ্যে দিন পার করছেন। লেবাননে হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ করেন। এদের মধ্যে যারা সরাসরি যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে আছেন, তাদের প্রায় ৯০% কর্মী এখন তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতি মাসে দেশে পরিবারের কাছে গড়ে ৩০০

থেকে৫০০ডলার পাঠানোর আশায় তারা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সেখানে পড়ে আছেন। এই ডলার আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ায়। কিন্তু এখন রেমিট্যান্সের বদলে দেশে ফিরছে তাদের রক্তাক্ত নিথর দেহ।

ইসরায়েলি হামলায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে গত ৮ এপ্রিল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দিপালী বেগম নামের আরেক বাংলাদেশি নারী শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। মাত্র এক মাসের সামান্য বেশি সময়ের ব্যবধানে ইসরায়েলি হামলায় তিনজন বাংলাদেশির এমন করুণ মৃত্যু লেবাননে থাকা পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করেছে। দিপালী বেগমের মৃত্যুর পর অনেক প্রবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বৈরুত ও এর আশপাশের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু নতুন কাজের অভাব, বাসাভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং যাতায়াতের ঝামেলার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে সেই সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেই থেকে গেছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সাতক্ষীরায় নিহত দুই কর্মীর গ্রামের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। যে মানুষগুলো প্রতি মাসে হাড়ভাঙা খাটুনি করে দেশে টাকা পাঠাতেন, তাদের এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবর পরিবারের সদস্যরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। স্বজনদের গগনবিদারী কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার আকাশ-বাতাস। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এই গরিব পরিবারগুলো এখন ঘোর অন্ধকারের মুখে পড়েছে। অনেক প্রবাসী চড়া সুদে ঋণ করে অথবা চাষের জমি বন্ধক রেখে বিদেশে যান। পরিবারের স্বপ্ন থাকে প্রবাসীর পাঠানো টাকায় সেই ঋণ দ্রুত শোধ করবে। কিন্তু এখন ঋণের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়েই পরিবারগুলোকে তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হচ্ছে।

লেবাননের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাও খুবই নাজুক। দেশটিতে গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১০০% থেকে ২০০% ছুঁয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম একেবারে আকাশছোঁয়া। এর ওপর যুদ্ধের দামামা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। একদিকে কাজের তীব্র অভাব, অন্যদিকে মাথার ওপর যেকোনো সময় বোমা পড়ার আতঙ্ক সব মিলিয়ে লেবাননে থাকা বাংলাদেশিরা এক অবর্ণনীয় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে তারা নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যাচ্ছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এখন লেবাননে থাকা কর্মীদের খোঁজখবর নিতে হবে এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

প্রবাসী কর্মীরা আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। যুদ্ধকবলিত লেবানন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারকে এখন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নিহত এই দুই কর্মীর মৃতদেহ যত দ্রুত সম্ভব সম্পূর্ণ সরকারি খরচে দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরা। ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা এই বিশাল ক্ষতি কিছুটা হলেও সামলে নিতে পারে। ইসরায়েলের এই বেপরোয়া ও নির্বিচার হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশকে কড়া প্রতিবাদ জানাতে হবে। ভিনদেশে আর কোনো নিরীহ বাংলাদেশিকে যেন এভাবে অকালে জীবন দিতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ