ভারতের রাজনীতিতে বড় পর্দার তারকাদের সফল পদার্পণের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তবে এবার তামিলনাড়ুতে যা ঘটল, তা এককথায় অভাবনীয়। জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে নামা ‘থালাপতি’খ্যাত সি. জোসেফ বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল এক রাজনৈতিক চমক দেখিয়েছে। রাজ্যের পুরোনো ও শক্তিশালী দুই দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-কে পেছনে ফেলে বিজয়ের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচনের এই ফল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
তামিলনাড়ু বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা ২৩৪। সরকার গঠন করতে হলে কোনো দল বা জোটকে ম্যাজিক ফিগার অর্থাৎ কমপক্ষে ১১৮টি আসন পেতে হয়। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই বিজয়ের দল টিভিকে রেকর্ড ১০৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা রাজ্যের অন্য যেকোনো দলের চেয়ে অনেক বেশি। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের দল ডিএমকে জোট পেয়েছে ৭৩টি আসন এবং এআইএডিএমকে জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তবে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হলেও সরকার গঠনের জন্য বিজয়ের দলের এখনো ১০টি আসনের ঘাটতি রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, বিজয় কীভাবে সরকার গঠন করবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের এই জাদুকরী সংখ্যা ছুঁতে হলে বিজয়কে এখন অন্য দলগুলোর সমর্থন নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তার সামনে দুটি প্রধান রাস্তা খোলা আছে। হয় তাকে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন ‘সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স’ (এসপিএ)-এর কোনো শরিক দলের সমর্থন নিতে হবে, অথবা এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের দিকে হাত বাড়াতে হবে। কংগ্রেস এই নির্বাচনে ৫টি আসন পেয়েছে এবং পিএমকে পেয়েছে ৪টি আসন। বিজয় চাইলে এই ছোট দলগুলোকে পাশে নিয়ে অনায়াসেই ১১৮ আসনের লক্ষ্যমাত্রা পার করতে পারেন।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিজয়ানন্দ জানান, গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত রাজ্যের রাজ্যপাল একক বৃহত্তম দল হিসেবে টিভিকে-কেই প্রথমে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। এরপর দলটিকে বিধানসভায় নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সাধারণত ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বিধানসভায় আস্থা ভোটে বিজয়কে জয়ী হতে হবে। যদি কোনো কারণে টিভিকে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজ্যপাল দ্বিতীয় বৃহত্তম জোটকে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। তবে টিভিকে নেতারা বেশ আত্মবিশ্বাসী। তারা জানিয়েছেন, আগামীকালই বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।
১০টি আসনের ঘাটতি নিয়ে দলের ভেতরে কোনো দুশ্চিন্তা আছে কি না, জানতে চাইলে টিভিকের প্রচার সম্পাদক নানজিল পি সাম্পাত খুব সহজ উত্তর দেন। তিনি বলেন, বাকি সমর্থন ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবেই’ তাদের কাছে চলে আসবে। কারণ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এমনটাই প্রত্যাশা করি’।
অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর এই বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। রাজ্যের কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গিরিশ শোডনকার জানিয়েছেন যে, তামিলনাড়ুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে কংগ্রেসের হাইকমান্ডকে সব কিছু অবহিত করেছেন। তিনি বলেন, দলের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধীকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং তারা বিজয়কে সমর্থন দেবে কি না, সে বিষয়ে খুব শিগগিরই দল থেকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-এর একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। বিজয় তার ক্যারিশমা, তারুণ্য এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দিয়ে সেই প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, থালাপতি বিজয় কি সত্যিই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তামিলনাড়ুর মসনদে বসতে পারবেন, নাকি রাজনীতির জটিল অঙ্কে নতুন কোনো মোড় আসবে? পুরো ভারতের নজর এখন তামিলনাড়ুর দিকে।
















