কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে দেশজুড়ে বজ্রপাতে ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চৈত্র ও বৈশাখ মাস মানেই কালবৈশাখী ঝড় আর বজ্রপাতের চরম আতঙ্ক। এই আতঙ্কেরই এক
মর্মান্তিক ও ভয়ংকর রূপ দেখল দেশবাসী। গত বুধবার সকাল থেকে শুরু করে
সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ের সময়
বজ্রপাতে সারা দেশে মোট ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের ৭টি আলাদা জেলায় এই
দুঃখজনক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই মাঠে কৃষিকাজ
করছিলেন, বৃষ্টির মধ্যে গবাদিপশু আনতে গিয়েছিলেন অথবা নদীতে মাছ
ধরছিলেন। জীবনের তাগিদে এবং জীবিকার সন্ধানে বাইরে থাকা এই খেটে খাওয়া
মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

বজরপাতের এই ভয়ংকর তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে।
এই একটি জেলাতেই একদিনে চারজন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় লোকজন
জানান, রাঙ্গাবালী এবং কলাপাড়া উপজেলায় বুধবার হঠাৎ করেই আকাশ কালো করে প্রবল
ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় মাঠে কৃষিকাজ করা অবস্থায় এবং বৃষ্টির হাত থেকে নিজেদের
গৃহপালিত গরু বাঁচাতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন তারা। চারজন কৃষক ও সাধারণ মানুষ
ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরিবারের উপার্জনক্ষম এই মানুষদের এমন হঠাৎ মৃত্যুতে
ওই এলাকার গ্রামগুলোতে এখন শুধুই শোকের মাতম চলছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

জামালপুর এবং বরগুনা জেলাতেও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেড়ে নিয়েছে আরও চারজনের তরতাজা
প্রাণ। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদে মাছ ধরতে গিয়ে এক যুবক এবং
খোলা জায়গায় রাস্তা নির্মাণের কাজ করার সময় আরেক যুবক সরাসরি বজ্রপাতে মারা
যান। অন্যদিকে, উপকূলীয় জেলা বরগুনার আমতলী ও পাথরঘাটা উপজেলায় আলাদা দুটি
ঘটনায় মাঠে কাজ করা এক পরিশ্রমী কৃষক এবং নদীতে থাকা এক জেলের মৃত্যু হয়।
ঝড়বৃষ্টির সময় এসব মানুষ দ্রুত কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ
পাননি বলেই এমন বিপদের মুখে পড়েন।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার ঘটনাটি মানুষের হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে এবং এটি একই
সাথে অলৌকিকও বটে। সেখানে এক যুবক বৃষ্টি শুরু হওয়ার ঠিক আগে তার ছোট্ট শিশু
সন্তানকে কোলে নিয়ে পাশের একটি দোকানে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে তাদের ওপর
বজ্রপাত হয়। ঘটনাস্থলেই ওই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং তিনি মাটিতে
লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাবার কোলে থাকা সেই ছোট্ট শিশুটির গায়ে
কোনো আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি, সে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। শিশুটি বর্তমানে সুস্থ থাকলেও,
চোখের সামনে বাবাকে হারানোর এই ঘটনা সবাইকে গভীরভাবে কাঁদিয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

এছাড়া রংপুর, শরীয়তপুর এবং বগুড়ায় আরও তিনজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই বজ্রপাত।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় হঠাৎ ঝড় শুরু হলে এক গৃহবধূ মাঠ থেকে নিজের
পালিত গরু আনতে দ্রুত ছুটে যান। সেখানে বজ্রপাতে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়ে
প্রাণ হারান। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় নদীতে মাছ ধরার সময় এক যুবক এবং
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় বিশাল ধানক্ষেতে কাজ করার সময় এক বৃদ্ধ কৃষক
বজ্রাঘাতে মারা যান। খোলা মাঠে বা পানিতে থাকা অবস্থায় মানুষের শরীর
বিদ্যুতের সুপরিবাহী হিসেবে কাজ করে বলেই এমন দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ মারা যায়, তার প্রায় ১৫% থেকে ২০%
মানুষের মৃত্যু হয় এই বজ্রপাতের কারণে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে এই দুর্যোগ
সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। সরকার সাধারণত বজ্রপাতে মারা যাওয়া প্রতিটি দরিদ্র
পরিবারকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সাহায্য হিসেবে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে থাকে,
যা বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ (ডলার) এর সমান।
কিন্তু একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী মানুষের জীবনের মূল্য এই
সামান্য অর্থ দিয়ে কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা দেশের সাধারণ মানুষকে বারবার সতর্ক করে বলেন, আকাশে ঘন কালো মেঘ
জমলে বা বজ্রপাতের শব্দ শুনলে সবাইকে দ্রুত নিরাপদ ও পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে
হবে। বজ্রপাত ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে প্রচুর তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা
পরিবেশ রক্ষায় দারুণ কাজ করে। তবে সাধারণ মানুষকেও এখন নিজেদের জীবনের সুরক্ষায়
সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আমাদের দেশের কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের আবহাওয়ার
পূর্বাভাস মেনে কাজে বের হওয়ার অভ্যাস করতে হবে। একটু সচেতন হলেই এমন
অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব হবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ