ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলায় শুরু হয়েছে বিধানসভা নির্বাচন। একটি দেশের
অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের সরাসরি প্রভাব এবার পড়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাধারণ
যাত্রীদের ওপর। এই নির্বাচন উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ
ও ভারতের মধ্যকার চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এবং ওপারে ভারতের গেদে সীমান্ত বন্দর দিয়ে
পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল তিন দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয়
কর্তৃপক্ষ। সোমবার, ২৭ এপ্রিল থেকে এই কড়া সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। হঠাৎ করে
সীমান্ত পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত বাংলাদেশি যাত্রী চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ
করে যারা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা করে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার টিকিট কেটেছিলেন,
তাদের এখন বাধ্য হয়েই কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।
সোমবার সকালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেশের সাধারণ মানুষ ও
সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে। দর্শনা ইমিগ্রেশনের ইনচার্জ সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই)
তুহিন বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশনা অনুযায়ী ভারতীয় ইমিগ্রেশন এই
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। এসআই তুহিন আরও জানান, সোমবার সকাল ৯টা ২০ মিনিট থেকে
দর্শনা আইসিপির কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে সব ধরনের বাংলাদেশি
যাত্রীর ভারতে প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় গেদে ইমিগ্রেশন
কর্তৃপক্ষ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিঠি অনুযায়ী, আগামী ২৯
এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
তবে এই টানা তিন দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও একটি বিশেষ ছাড় রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে যেসব ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন কাজে বা ভ্রমণে বাংলাদেশে
অবস্থান করছেন, তারা চাইলে এই সময়ের মধ্যে দর্শনা সীমান্ত ব্যবহার করে
নির্বিঘ্নে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন। তাদের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা
কোনোভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ইমিগ্রেশন পুলিশ আশ্বস্ত করে জানায়, নদিয়া জেলায়
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর আগামী ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এই
আন্তর্জাতিক রুটে আবার আগের মতো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে যাত্রী চলাচল শুরু হবে।
ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের দর্শনা সীমান্ত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এবং ভারতের গেদে সীমান্তটি দুই দেশের মানুষের যাতায়াতের জন্য
অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থলপথ। ট্রেনের ভালো সুবিধা থাকায়
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ পাসপোর্টধারী যাত্রী এই পথ দিয়ে
যাতায়াত করেন। কলকাতা যাওয়ার জন্য এই রুটটি মানুষের কাছে বেশ সাশ্রয়ী। যারা
এই পথ ব্যবহার করেন, তাদের একটি বিশাল অংশ ভারতে যান মূলত উন্নত চিকিৎসার খোঁজে।
সাধারণত চিকিৎসা, কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য যাত্রীরা জনপ্রতি
৫০০ থেকে শুরু করে ২,০০০ ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা
নিজেদের সাথে নিয়ে যান। তিন দিন পারাপার বন্ধ থাকায় এই বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে এখন
সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ের দিক বিবেচনা করলেও এই দর্শনা চেকপোস্টের বড়
একটি ভূমিকা রয়েছে। যাত্রীদের ভ্রমণ কর বা ট্রাভেল ট্যাক্স বাবদ বাংলাদেশ
সরকার প্রতিদিন এখান থেকে বিপুল টাকা রাজস্ব হিসেবে আয় করে। পরিসংখ্যানে দেখা
যায়, ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি যাত্রীদের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মানুষ শুধু
চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই দেশটিতে যান। হঠাৎ বর্ডার বন্ধ থাকার কারণে অনেক
মুমূর্ষু রোগীর আগে থেকে নেওয়া ভারতীয় ডাক্তারদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট
বাতিল হয়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া দুই সীমান্তের আশপাশে গড়ে
ওঠা পরিবহন ব্যবসা, মানি এক্সচেঞ্জ, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোও এই তিন দিন বড়
ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
নির্বাচনের সময় সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতেই ভারত সরকার
সব সময় এমন কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স
(বিএসএফ) সীমান্তে নিজেদের টহল আগের চেয়ে অন্তত ৫০% বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা
রাতদিন কড়া নজরদারি রাখছে। বর্ডার কর্তৃপক্ষের অনুরোধ, আগামী ৩০ এপ্রিল সকাল
পর্যন্ত দর্শনা ইমিগ্রেশন পয়েন্টে কেউ অহেতুক ভিড় জমাবেন না। যাদের খুব
জরুরি দরকারে এই মুহূর্তেই ভারতে যাওয়া প্রয়োজন, তারা বিকল্প হিসেবে বেনাপোল বা
অন্য কোনো চালু সীমান্ত চেকপোস্ট ব্যবহার করতে পারেন। ভ্রমণের আগে বর্তমান
পরিস্থিতি জেনে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
















