হরিণাকুন্ডুতে যুব সমাজের কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ও কৃষিপ্রধান উপজেলা হলো হরিণাকুন্ডু। নবগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই শান্ত জনপদের মানুষের মূল পেশা চিরকালই কৃষি। কিন্তু সময়ের আবর্তনে জনসংখ্যা বেড়েছে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। একসময় এই এলাকার তরুণদের কাছে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পেছনে ঘোরা ছাড়া আর কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। দিনের পর দিন চাকরির অপেক্ষা করতে করতে অনেক মেধাবী যুবকই হতাশায় নিমজ্জিত হতেন। অন্যদিকে, গতানুগতিক কৃষিকাজে কায়িক শ্রম বেশি ও লাভ কম হওয়ায় শিক্ষিত তরুণদের সেখানেও খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত আশার কথা হলো, সময়ের সাথে সাথে হরিণাকুন্ডুর এই দৃশ্যপট এখন একেবারেই পাল্টে গেছে। এখানকার যুব সমাজ এখন আর শুধু চাকরির আশায় বসে থেকে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে না। নিজেদের মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও আধুনিক চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেরাই এখন নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। হরিণাকুন্ডুতে যুব সমাজের কর্মসংস্থানে এখন এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে, যা পুরো এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে।

কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া ও যুব উদ্যোক্তা

হরিণাকুন্ডুর শিক্ষিত তরুণরা কৃষিকে এখন আর কেবল জীবন বাঁচানোর সাধারণ উপায় হিসেবে দেখছেন না, বরং একে একটি সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। গতানুগতিক ধান, পাট বা গম চাষের পাশাপাশি তারা এখন উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ড্রাগন ফল, মাল্টা, পেয়ারা, বাউকুল ও উন্নত জাতের কলা চাষ করে অনেকেই এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এছাড়া বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, বিশেষ করে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছের উৎপাদন, এবং উন্নত জাতের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা মাটির গুণাগুণ, সঠিক সার প্রয়োগ ও আধুনিক চাষাবাদের কলাকৌশল শিখছেন। এই শিক্ষিত তরুণদের হাত ধরেই হরিণাকুন্ডুর কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটছে এবং নিজের পাশাপাশি তারা গ্রামের আরও অনেক সাধারণ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তির নীরব বিপ্লব

তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা হরিণাকুন্ডুর মতো মফস্বল এলাকায় কর্মসংস্থানের এক বিশাল দরজা খুলে দিয়েছে। এখন আর আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য ঢাকা বা অন্য কোনো বড় শহরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গ্রামের বাড়িতে বসেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বা মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, এসইও (SEO) ও কনটেন্ট রাইটিংয়ের মতো কাজ করে তারা প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা, এমনকি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করছেন। ফ্রিল্যান্সিং করে স্বাবলম্বী হওয়া এই যুবকরা এখন শুধু নিজেরা আয় করছেন না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে আইটি সেন্টার খুলে অন্যদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ফলে হরিণাকুন্ডুতে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ আইটি কমিউনিটি গড়ে উঠছে, যা বেকারত্ব দূর করতে জাদুর মতো কাজ করছে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

হরিণাকুন্ডুর যুব সমাজের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা এখন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তুলছেন। হাতের কাজ, নকশীকাঁথা তৈরি, ব্লক-বাটিকের কাজ, পোশাক তৈরি ও সেলাইয়ের মাধ্যমে তারা ঘরে বসেই সম্মানজনক আয় করছেন। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, উৎপাদিত এসব পণ্য বিক্রির জন্য এখন আর কোনো ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয় না। স্মার্টফোনের কল্যাণে ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন ই-কমার্স সাইট ব্যবহার করে তারা সরাসরি সারাদেশের ক্রেতাদের কাছে নিজেদের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। এভাবেই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো একসময় বড় ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে এবং নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও আত্মকর্মসংস্থান

সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি হরিণাকুন্ডুর তরুণদের আগ্রহ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। তারা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, হাতে-কলমে বাস্তবমুখী কাজ জানা থাকলে কোনো মানুষ কখনো বেকার বসে থাকে না। মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ হার্ডওয়্যার মেরামত, রেফ্রিজারেটর ও এসি মেরামত থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল মেকানিক্সের কাজ শিখে অনেক তরুণ স্থানীয় বাজারগুলোতে নিজেদের ছোট ছোট দোকান বা ওয়ার্কশপ দিচ্ছেন। এসব কাজ একদিকে যেমন তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করছে, তেমনি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনও খুব সহজেই মেটাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ এই যুবকরা চাইলে ভবিষ্যতে দেশের বাইরে গিয়েও অনেক ভালো বেতনে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের ইতিবাচক ভূমিকা

তরুণদের এই সফল অগ্রযাত্রায় সরকারের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুব উন্নয়ন থেকে হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, সেলাই প্রশিক্ষণ বা আইটি বিষয়ক নানামুখী প্রশিক্ষণ বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে, যাতে তারা কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এই সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা তরুণদের নতুন কাজে ঝুঁকি নিতে অনেক বেশি সাহস জোগাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন সেমিনারের আয়োজন তরুণদের সঠিক পথ নির্বাচনে দারুণভাবে সাহায্য করছে।

কিছু চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

কর্মসংস্থানের এই নতুন সম্ভাবনাগুলো যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, বাস্তবে এখনো কিছু ছোটখাটো বাধাও রয়ে গেছে। এখনো অনেক গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের কিছুটা ঘাটতি দেখা যায়, যা ফ্রিল্যান্সার ও আইটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। এছাড়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ, যা অনেক সময় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আরও আন্তরিক হতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত ব্রডব্যান্ড সেবার মান নিশ্চিত করা এবং উদ্যোক্তা ঋণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত করার মাধ্যমে তরুণদের পথচলা আরও মসৃণ করা সম্ভব।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

উপসংহার

হরিণাকুন্ডুতে যুব সমাজের কর্মসংস্থানে যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে পুরো বাংলাদেশের অন্যান্য উপজেলার জন্যই এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। তারুণ্যের শক্তি অসীম এবং অপরিমেয়। এই শক্তিকে যদি সঠিক পথে ও সঠিক পরিকল্পনায় পরিচালিত করা যায়, তবে কোনো জনপদই আর দারিদ্র্যের অন্ধকারে পিছিয়ে থাকতে পারে না। শুধুই সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই যখন কর্মদাতা হওয়ার বিশাল স্বপ্ন দেখছেন হরিণাকুন্ডুর এই তরুণরা, তখন একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সরকারের অব্যাহত সহযোগিতা, স্থানীয় সমাজের উৎসাহ এবং নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এভাবেই বেকারত্বের অন্ধকার দূর করে হরিণাকুন্ডুকে একটি স্বনির্ভর, উন্নত ও আধুনিক উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলবে। আগামী দিনের স্মার্ট ও সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই উদ্যমী যুব সমাজই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও হাতিয়ার।




ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ