ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসতে আর বেশি দিন বাকি নেই। ঈদের আমেজ এখন গ্রামের প্রতিটি খামারে। ঝিনাইদহ জেলার আনাচকানাচে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। কোরবানির পশু প্রস্তুত করতে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় তারা নিজেদের সবটুকু সময় ও মনোযোগ ঢেলে দিয়েছেন। তবে এবার প্রকৃতির আচরণ কিছুটা রুক্ষ। প্রচণ্ড গরমের কারণে গরুর খাবার খাওয়ানো থেকে শুরু করে গোসল করানোর ক্ষেত্রে খামারিদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। একটি বড় সুখবর হলো, এ বছর ঝিনাইদহ জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। উল্টো চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫৬ হাজার ৯৭৭টি গরু ও ছাগল উদ্বৃত্ত বা বেশি রয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চরখাজুরা দক্ষিণপাড়া গ্রামের একজন সাধারণ খামারি মানোয়ার হোসেন। তাঁর খামারে গেলে দেখা যায়, পরম মমতায় তিনি তাঁর ৭টি গরুকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করছেন। প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচাতে তিনি বারবার পানি দিয়ে গরুগুলোকে গোসল করাচ্ছেন এবং পরিষ্কার কাপড় দিয়ে গা মুছে দিচ্ছেন। মানোয়ার হোসেন জানান, কোরবানির হাটে তোলার আগে গরুকে পরিষ্কার ও সুস্থ রাখা খুব জরুরি। তাঁর খামারের প্রতিটি গরুর পেছনে তিনি অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তিনি আশা করছেন, এবার হাটে এক একটি গরু গড়ে আড়াই লাখ থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা দামে বিক্রি করতে পারবেন।
মানোয়ার হোসেনের মতো জেলার প্রতিটি উপজেলার ছোট-বড় সব খামারিই এখন শেষ মুহূর্তের এই পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সাধারণত খামারিরা ৭ থেকে ৮ মাস ধরে গরুগুলোকে খুব যত্ন নিয়ে হৃষ্টপুষ্ট করে থাকেন। এই সময়ে তারা গরুর খাবারের মানের দিকে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখেন। প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বিচালি বা শুকনো খড়, ছোলা, ভুসি ও খৈলকে খাবারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা। বাজারে বর্তমানে ভুসি ও খৈলের দাম আগের তুলনায় খুব একটা বাড়েনি, যা খামারিদের জন্য একটি স্বস্তির খবর। তাছাড়া গরুর প্রধান খাবার বিচালির দাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমেছে। তবে গুটিকয়েক খামারি অভিযোগ করেছেন যে, কিছু কিছু এলাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা খাবারের দাম সামান্য বাড়িয়েছেন।
গরু পালনে খামারিদের মূল টার্গেট থাকে কোরবানির হাট। খামারিরা মনে করেন, বাজারে যদি ভারতীয় বা বাইরের গরুর অবৈধ প্রবেশ ঠেকানো যায় এবং দাম ভালো থাকে, তবে তাদের পরিশ্রম স্বার্থক হবে। দীর্ঘ কয়েক মাসের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের পর একটি ভালো দাম পেলে তাদের মুখে হাসি ফোটে। দেশের অর্থনীতিতেও কোরবানির পশুর বাজারের বিশাল প্রভাব রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই কোরবানির বাজারকে ঘিরে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার বা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ($) বিশাল আর্থিক লেনদেন হয়, যা সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
এদিকে, প্রচণ্ড গরমে পশু যাতে অসুস্থ না হয়ে পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে বলছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আতিকুজ্জামান জানান, খামারিদের সচেতন করতে তারা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। গরুকে পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি পান করানো এবং ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখার ওপর তারা জোর দিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, এবার পশু হাটগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন। প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম বা পশুর ডাক্তারদের বিশেষ দল কাজ করবে, যাতে কোনো পশু অসুস্থ হলে সাথে সাথে চিকিৎসা দেওয়া যায়।
ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানির জন্য জেলায় পশু প্রস্তুতির চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক। পুরো জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার ৭৮০টি খামার রয়েছে। এসব খামারে এবার ৯৩ হাজার ৫৭২টি গরু এবং ১ লাখ ৪৮ হাজার ছাগল কোরবানির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে এই বিপুল সংখ্যক উদ্বৃত্ত পশু ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরের হাটে পাঠানো হবে। সব মিলিয়ে খামারিরা এবার একটি ভালো ব্যবসার আশা করছেন।
















