বৈশাখ মাসের শেষ দিকে এসে প্রকৃতি যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। চারদিকে তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরম। এই অসহনীয় গরমের মধ্যেই জীবনের তাগিদে মাঠে কাজ করতে গিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়নে পাট খেতে কাজ করার সময় হিট স্ট্রোকে শাহিন আলম নামের ৪০ বছর বয়সী এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে উপজেলার নিত্যানন্দনপুর গ্রামে এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের কৃষক বেনজীর আলীর ছেলে। তার এই হঠাৎ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় গ্রামের মানুষ জানান, এখন মাঠে মাঠে পাটের মৌসুম চলছে। সব কৃষকই পাটের জমিতে আগাছা পরিষ্কার ও নিড়ানির কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন। শাহিন আলমও সোমবার সকালে বাড়ি থেকে পান্তা ভাত খেয়ে প্রতিদিনের মতো নিজের জমির উদ্দেশ্যে বের হন। সকাল থেকেই আকাশে কড়া রোদ ছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকে। বাতাসের আর্দ্রতাও ছিল প্রায় ৭০% থেকে ৮০%, যার কারণে ভ্যাপসা গরমে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। এরপরও নিজের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তায় শাহিন আলম একটানা জমিতে কাজ চালিয়ে যান। কয়েক ঘণ্টা রোদে পুড়ে কাজ করার পর হঠাৎ তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ বোধ করেন এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে নিজের জমির কাদার মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন।
প্রথমদিকে শাহিন আলমের পড়ে যাওয়ার বিষয়টি কেউ খেয়াল করেননি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাশের জমিতে কাজ করা অন্য কৃষকরা তাকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তারা দৌড়ে এসে দেখেন শাহিন আলম পুরোপুরি অচেতন। তারা আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি। কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসার জন্য সরাসরি শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে থাকা কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণেই তিনি ভয়াবহ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
শাহিন আলমের এমন অকাল মৃত্যুর খবর তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা ডুকরে কেঁদে জানান, শাহিন আলমই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার ছোট ছোট দুটি সন্তান রয়েছে। সামান্য আয় দিয়েই তাদের পুরো সংসার চলত। এখন পরিবারের একমাত্র আয়ের মানুষটিকে হারিয়ে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রতিবেশীরা দলে দলে তাদের বাড়িতে এসে শোকাহত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গ্রামের মানুষ আক্ষেপ করে বলেন, শাহিন আলম অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের একজন ভালো মানুষ ছিলেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের দেশের কৃষকদের বর্তমান অসহায় অবস্থাকে আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এলাকাবাসী জানান, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের এই অঞ্চলে গরমের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দুপুরের দিকে রোদের তেজ এতটাই বেশি থাকে যে খোলা মাঠে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন। তারপরও পেটের দায়ে গরিব কৃষকদের মাঠে নামতে হয়। অনেক কৃষক মাথায় ভেজা গামছা বেঁধে কিংবা সাথে বোতলে করে পানি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু একটানা এমন ভয়ংকর গরমে কাজ করলে শরীর তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না। ফলে কৃষকরা প্রায়ই মাঠে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের জন্য বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, এই তীব্র দাবদাহের সময় সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি খোলা আকাশের নিচে কাজ করলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৯০% বেড়ে যায়। মানুষের শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে প্রথমে মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব এবং পেশিতে টান ধরার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কারও এমন অবস্থা হলে তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত ও ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যেতে হবে। তার শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। অবস্থার উন্নতি না হলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন প্রতি বছরই গরমের তীব্রতা আগের রেকর্ড ভাঙছে। তাই আবহাওয়া নিয়ে আমাদের দেশের কৃষকদেরও এখন নতুন করে ভাবতে হবে। স্থানীয় সচেতন মানুষ দাবি তুলেছেন, গরমের সময় কৃষকদের সুরক্ষার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশাসনকে সচেতনতামূলক প্রচার আরও বাড়াতে হবে। কৃষকদের এখন থেকে কাজের সময় পরিবর্তন করতে হবে। খুব ভোরে মাঠে গিয়ে কাজ শুরু করে রোদ বাড়ার আগেই বাড়ি ফেরা, অথবা বিকেলে রোদ কমার পর আবার কাজ শুরু করার অভ্যাস গড়তে হবে। একটানা কাজ না করে গাছের ছায়ায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। একটু সচেতন হলে হয়তো শাহিন আলমের মতো আর কোনো পরিশ্রমী কৃষকের প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে যাবে না।
















