ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করা তার দীর্ঘদিনের একটি অধরা স্বপ্ন। অবাক করার বিষয় হলো, তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে তার সেই স্বপ্ন এবার সত্যিই বাস্তবায়িত হতে চলেছে। ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলকে হটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
গত সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভোট গণনায় দেখা যায়, বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এগিয়ে আছে। মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৬টিতে জয়ী অথবা এগিয়ে রয়েছে, যেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা মাত্র ৮০-এর ঘরে আটকে আছে। সবচেয়ে বড় চমক ছিল বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসনে পরাজয়। তিনি বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন। ফল ঘোষণার আগে ক্ষুব্ধ মমতা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনে ১০০টিরও বেশি আসন লুট করা হয়েছে এবং তিনি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিজেপির এই জয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত অভিনব বলে মনে করছেন। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বেশিরভাগ জরিপেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ভোটাররা বিজেপিকেই নিরঙ্কুশভাবে বেছে নিয়েছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় তৃণমূল একটি আসনও পায়নি। গতবারের জেতা মাত্র ৬টি আসনের বিপরীতে উত্তর চব্বিশ পরগনায় এবার বিজেপি ১৮টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। দলটির মোট ভোটের হার ৮% বেড়ে ৪৫%-এ দাঁড়িয়েছে, যেখানে তৃণমূলের ভোট কমে ৪১% হয়েছে।
বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের ‘এসআইআর’ (নিবিড় সংশোধন) প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তৃণমূল একে ‘বাংলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ বলে প্রচার করলেও, জনগণ বরং বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের দুর্নীতিমুক্ত প্রতিশ্রুতির ওপর বেশি ভরসা রেখেছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন রাজ্য সরকারের ওপর ভরসা না রেখে সাড়ে ছয় শ পুলিশ কর্মকর্তা ও আমলাকে বদলি করে এবং ভোট গণনার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় কর্মীদের হাতে তুলে দেয়। পাশাপাশি জালিয়াতি ঠেকাতে রাজ্যে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী ও দুই লাখ সিসিটিভি ক্যামেরা মোতায়েন করা হয়। তৃতীয় কারণটি হলো, তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ওপর কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর (যেমন সিবিআই ও ইডি) কড়া নজরদারি ও চাপ প্রয়োগ।
এই বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখন বড় একটি প্রশ্নের বিষয়। আসাম ও ত্রিপুরায় আগে থেকেই বিজেপির শাসন রয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গেও তাদের শাসন কায়েম হলো। বিশেষ করে বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বাধা ছিল, এবার তা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ, এতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া বিরোধিতার কারণেই এই চুক্তিটি আটকে ছিল।
এখন দেখার বিষয়, নতুন এই বিজেপি সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হয়।
















