বাংলাদেশের মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও নির্বাচন সব সময়ই একটি বাড়তি আগ্রহ
ও কৌতূহলের বিষয়। ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর মিল থাকায় ওপারে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কী
ঘটছে, তা জানতে এপারেও অনেকেই টিভির পর্দায় বা সংবাদপত্রে চোখ রাখেন। বুধবার,
২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে
একটি গুরুত্বপূর্ণ দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে সাধারণ
মানুষের চোখেমুখে এক অন্য রকম আনন্দ ও স্বস্তি দেখা গেছে। অতীতের সব ভয়, সংশয় ও
আতঙ্ক দূরে ঠেলে দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার প্রায় সব কটি বুথে সকাল থেকেই
মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। বিশেষ করে নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবার
সবার নজর কেড়েছে।
ভোটের মাঠে এবার সবচেয়ে বড় চমক ছিল সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতির হার। নির্বাচন
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কেন্দ্রে এবার
প্রায় ৯০% থেকে ৯৮% পর্যন্ত ভোট পড়েছে, যা সত্যিই একটি অভাবনীয় বিষয়। অতীতে
যারা রাজনৈতিক সংঘাত, বুথ দখল ও পেশিশক্তির ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পেতেন
না, এবার তারাও নির্ভয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক নারী ও প্রবীণ ভোটার সাংবাদিকদের হাসিমুখে
জানিয়েছেন, তারা তাদের জীবনে এর আগে কখনো এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হতে দেখেননি। বেলা যত বেড়েছে, ভোটারদের লাইন তত দীর্ঘ
হয়েছে, তবুও প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও মানুষের মধ্যে কোনো বিরক্তি ছিল না।
নির্বাচনের দিন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমিয়েছিলেন বিভিন্ন
রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং বিনোদন জগতের জনপ্রিয় সব তারকারা। পশ্চিমবঙ্গের
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক
অভিষেক ব্যানার্জি এবং প্রধান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিজ নিজ এলাকার
বুথে গিয়ে অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতোই ভোট দিয়েছেন। এছাড়া অরূপ বিশ্বাস, মদন
মিত্র, ফিরহাদ হাকিম, শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়, সজল ঘোষ, অর্জুন সিং,
কৌস্তভ বাগচী, রত্না চট্টোপাধ্যায় এবং তাপস রায়ের মতো প্রভাবশালী
রাজনীতিকরা নিজেদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
শুধু রাজনীতিকরাই নন, রূপালি পর্দা এবং খেলার মাঠের তারকারাও এদিন ভোটকেন্দ্রের
আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক সফল
অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী ও তার স্ত্রী বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী ডোনা
গাঙ্গুলী ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি দুই বাংলার জনপ্রিয়
মুখ, অভিনেতা ও রাজনীতিক রাজ চক্রবর্তী, শ্রাবন্তী চ্যাটার্জী, অদিতি মুন্সি,
সায়ন্তিকা ব্যানার্জি, রূপা গাঙ্গুলী এবং সোহমের মতো তারকারা হাসিমুখে বুথ
থেকে বেরিয়ে নিজেদের কালির দাগ দেওয়া আঙুল সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে
কলকাতার বুথগুলো এদিন যেন সত্যিকারের তারার মেলায় পরিণত হয়েছিল।
এবারের নির্বাচনে এমন অভাবনীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার পুরো কৃতিত্ব দেওয়া
হচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। তাদের কড়া নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের
কারণে কলকাতা সহ আশপাশের উত্তেজনাপূর্ণ জেলাগুলোতেও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর
ঘটনা ঘটতে পারেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরই বুথের সামনে ক্যাম্প
করতে বা অযথাই জটলা পাকাতে দেওয়া হয়নি। ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে
এমন একটি বড় নির্বাচনের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর
প্রচার, ব্যানার, নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ
মিলিয়ে এই নির্বাচনি অর্থনীতির আকার অনায়াসেই কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বা কয়েক শ
কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এত বিশাল আয়োজনের একটাই লক্ষ্য থাকে, সাধারণ মানুষের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তবে ভোটের মাঠের আসল হিসাব-নিকাশ বা ফলাফল কী হতে পারে, তার কিছুটা পরিষ্কার আঁচ
পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় বাজারগুলোর পরিস্থিতি থেকে। ভারতের রাজনীতিতে
নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর আনন্দ উদ্যাপন করার জন্য আগে
থেকেই দলীয় কর্মীরা আবির বা রঙের গুঁড়ো কিনে রাখেন। কলকাতার বিভিন্ন বাজারের
দোকানিরা এবার এক অবাক করা তথ্য দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এবার বাজারে শাসক
দলের প্রতীকী রং হিসেবে পরিচিত সবুজ আবিরের বিক্রি বেশ কমে গেছে। এর বদলে
দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বিরোধী শিবিরের প্রতীকী গেরুয়া রঙের আবির। আবির
বিক্রির এই নতুন প্রবণতা এবং সাধারণ মানুষের নির্ভীক কথাবার্তা শুনে অনেকেই
জল্পনা শুরু করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে হয়তো সত্যি সত্যিই একটি নতুন সরকার গঠিত
হতে চলেছে।
















