যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজল যখন, তখন পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে যেন একটাই রং হলুদ। সবুজ ঘাসের ওপর ছুটে এল এক বিশাল হলুদ ঢেউ। ডাগআউটের পাশে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রাজিলের অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তাঁর চোখে সেই পরিচিত স্থিরতা, কিন্তু ভেতরে নিশ্চয়ই এক বিশাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আর একটু দূরে, দুই হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। যেন তিনি নিজেই বুঝে উঠতে পারছেন না, মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে তিনি ঠিক কী করে ফেললেন! নব্বই মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর নাটক পেরিয়ে, যোগ করা সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ৯৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির পায়ের ঠিকানায় এসে পৌঁছেছিল একটা বল। আর সেই বলটা ডান পোস্টের ভেতর দিক ছুঁয়ে সোজা জালে গিয়ে বসল, যেন কোনো ডাকপিয়ন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট ঠিকানায় একটি জরুরি চিঠি পৌঁছে দিয়েছে। জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকির হাত সেই বল কোনোভাবেই ফেরাতে পারত না।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ৬৮ হাজার ৭৭৭ জন মানুষের মধ্যে যেন অর্ধেকের বুক থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল হাহাকারের মতো, আর বাকি অর্ধেক সেটাকে স্বস্তির শ্বাস দিয়ে গিলে নিল। ব্রাজিল জিতল ২-১ গোলে। আর এই রোমাঞ্চকর জয়ের মাধ্যমেই ব্রাজিল টিকে থাকল বিশ্বকাপে এবং নিশ্চিত করল শেষ ষোলোর টিকিট!
তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে যে ব্রাজিলকে দেখা গেল, সে যেন ঘুমের ভেতরে হাঁটা কোনো অচেনা মানুষ। পা নড়ছে ঠিকই, কিন্তু খেলায় কোনো চোখ বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। বলের দখলে এগিয়ে থেকেও তারা জাপানের অর্ধে গিয়ে বারবার দিশেহারা হয়ে পড়ছিল। যেন জাপানিদের সুশৃঙ্খল ও জমাট ডিফেন্সের দেয়ালে মাথা কুটে মরছিল আনচেলত্তির শিষ্যরা। একবার মাতেউস কুনিয়া প্রায় বিশ গজ দূর থেকে গায়ের ভার হারিয়েও একটি শট নিলেন, কিন্তু গোলরক্ষক সুজুকি খুব সাবধানে বলটা মুঠো করে রাখলেন। পুরো প্রথমার্ধে এই একটিই ছিল ব্রাজিলের সেরা চেষ্টা। কখনো কখনো মাঠে দেখা গেছে আনাড়িপনার চরম মহড়াও। ব্রুনো গিমারাইস একবার ভুল করে বল মারলেন সতীর্থ লুকাস পাকেতার মুখে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র রেগে গিয়ে চিৎকার করলেন গিমারাইসকে আগে পাস দাও, পরে ভাবো! আর সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো দুবার ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা একে অপরকে নিজেদের মধ্যেই ট্যাকেল করলেন। কোচ আনচেলত্তি বেঞ্চে বসে তখন কী ভাবছিলেন, সেটা তাঁর মুখের চিন্তিত রেখাই স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল।
আর ঠিক সেই ভুলের ফাঁক গলেই সুযোগ কাজে লাগাল জাপান। ম্যাচের ২৯ মিনিট। দানিলো মাঝমাঠে খুব বাজেভাবে বল হারালেন। জাপানের কাইশু সানো সেই বলটা তুলে নিলেন। আর তারপর যা হলো, সেটা যেন কোনো সাইলেন্ট ফিল্মের চমৎকার দৃশ্য। কাসেমিরো সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু সানো যেন তাঁকে দেখতেই পেলেন না। বল নিয়ে তিনি একাই বিশ গজ ছুটলেন, তারপর ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সরাসরি গোলপোস্ট লক্ষ্য করে এক বুলেট গতির শট নিলেন। বল চোখের পলকে ঢুকে গেল ব্রাজিলের বিশ্বস্ত গোলরক্ষক আলিসনের জালে। জাপানের সমর্থকেরা হিউস্টনকে আচমকা যেন টোকিও বানিয়ে দিলেন। সানোর এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম গোল, আর সেটি এল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মতো এত বড় মঞ্চে!
দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তি বাধ্য হয়ে মাঠে নামালেন তরুণ সেনসেশন এনদ্রিককে। পাকেতার বদলে, চোটের কারণে এই পরিবর্তন। কিন্তু পরিবর্তনটা শুধু খেলোয়াড়ের ছিল না, ছিল মেজাজের এবং কৌশলেরও। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল যেন হঠাৎ করে ঘুম থেকে জেগে উঠল। ৫৪ মিনিটে একটি ক্রস এল পেছনের পোস্টে, কাসেমিরো ঝাঁপিয়ে পড়ে হেড করলেন। তোমিয়াসু ও সুজুকি দুজনেই ছুঁলেন বলটা। গোললাইনের কথা মনে হচ্ছিল, কিন্তু ভিএআর (VAR) জানাল গোল হয়নি। তবে গোল হলো ঠিক তার দুই মিনিট পরে। গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির একটি নিখুঁত ক্রস ভেসে এল পেছনের পোস্টে। কাসেমিরো লাফ দিয়ে হেড করে বল পাঠালেন গোলমুখে স্কোরলাইন তখন ১-১। ৩৪ বছর ১২৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপে গোল করলেন কাসেমিরো। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৯৮ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে গোল করা বেবেতোর পর ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড গড়লেন।
এরপর ম্যাচে এল আরেকটি জাদুকরী মুহূর্ত। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বল পেলেন, নিখুঁতভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখলেন, জাপানি ডিফেন্ডার তোমিয়াসুকে নাটমেগ করে এগিয়ে গিয়ে জোরালো শট নিলেন। কিন্তু গোলরক্ষক সুজুকি বুড়ো আঙুল দিয়ে বলটি পোস্টে ঠেলে দিয়ে দলকে বাঁচিয়ে দিলেন। এ গোল হলে কী হতো, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে গেল। ম্যাচ ঢুকল শেষ দশ মিনিটে। তারপর রেফারি যোগ করলেন অতিরিক্ত ছয় মিনিট। সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে রায়ান বল জিতলেন ওপরে, ভেতরে পাস দিলেন গিমারাইসকে। গিমারাইস শুট করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। তিনি বল দিলেন মার্তিনেল্লিকে। মার্তিনেল্লি নিখুঁত শটে বল পাঠালেন জালে।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে তখন যে গগনবিদারী শব্দ উঠল, সেটা শুধু বিজয়ের নয়, বরং এক বিশাল স্বস্তির। ব্রাজিল এগিয়ে গেল শেষ ষোলোতে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষায় আছে আইভরিকোস্ট বা নরওয়ে। কিন্তু এই ব্রাজিল দলকে সামনে আরও এক হতে হবে। প্রথমার্ধের সেই ছত্রভঙ্গ ব্রাজিল এবং দ্বিতীয়ার্ধের জেগে ওঠা ব্রাজিল দুটো এক দেশের পাসপোর্ট বহন করলেই এক দল হয় না। তারপরও হিউস্টনে আজ হলদে উৎসব হচ্ছে। আর সেই উৎসবে একটাই নাম মানুষের মুখে মুখে মার্তিনেল্লি!














