“ভয় পাও, সবাই ভয় পাও!” মায়ামি স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর ব্রাজিলের এই অনুচ্চারিত বার্তাটি যেন বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ ওঠা বাকি সব দলের কাছে খুব পরিষ্কারভাবে পৌঁছে গেল। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিল ঠিক ব্রাজিলের মতোই দাপট দেখিয়ে ফিরে এসেছে। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ‘সি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউট বা শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে উঠেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই জয়ের ফলে ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে যে স্বস্তি ও আনন্দ ফিরে এসেছে, তা তাদের গ্যালারির উদ্যাপন দেখলেই বোঝা যায়।
এই ম্যাচের আগে সমীকরণটা বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। একই গ্রুপ থেকে মরক্কো ও ব্রাজিল দুই দলই যদি নিজেদের শেষ ম্যাচে জেতে, তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করতে গোলের হিসাব-নিকাশে যেতে হবে। আটলান্টায় একই সময় শুরু হওয়া গ্রুপের অন্য ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৪-২ গোলে দারুণ জয় তুলে নেয় মরক্কো। কিন্তু মায়ামি স্টেডিয়ামে খেলা কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল দলের আটলান্টার স্কোরলাইনের খোঁজখবর নেওয়ার কোনো দরকারই পড়েনি। কারণ, তারা নিজেদের কাজটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবেই করেছে।
মাঠে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের পায়ে হয়তো সেই পুরোনো দিনের ‘জোগো বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল পুরোপুরি ফেরেনি, তবে গ্যালারিতে সাম্বার ঢেউ ঠিকই উঠেছিল। মাঠে ভিনির অসাধারণ জোড়া গোলে তাল মিলিয়ে গ্যালারিতে হলুদ জার্সির সমর্থকদের আর কোনোভাবেই আটকে রাখা যায়নি। ম্যাচের ৬০ মিনিটে মাতেউস কুনিয়ার শেষ গোলটির পর ধারাভাষ্যকারও আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলে ওঠেন, “ব্রাজিল ইজ ব্যাক উইথ বিউটি!”
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত ছন্দময় ও আক্রমণাত্মক ব্রাজিল দলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর হাইতির বিপক্ষে পরের ম্যাচে ৩-০ গোলের জয় পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তির দলের ধীরগতির খেলা দর্শকদের বেশ হতাশ করেছিল। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একই স্কোরলাইনে জিতলেও ভিনি ও কুনিয়াদের আগ্রাসী খেলায় এবার সমর্থকদের মন পুরোপুরি ভরেছে। এর পাশাপাশি দর্শকদের জন্য আরেকটি বড় স্বস্তির খবর ছিল দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে আবার মাঠে নামলেন সবার প্রিয় তারকা নেইমার। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে কুনিয়ার বদলি হিসেবে নেইমার যখন মাঠে নামেন, তখন পুরো গ্যালারি ‘ওলে, ওলে, নেইমার’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
নাচ ও গানে মুখরিত হলুদ গ্যালারির সেই সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি শুধু আনচেলত্তির শিষ্যরাই তুলে নেয়নি, পয়েন্ট টেবিলেও তারা নিজেদের আধিপত্য দেখিয়েছে। ‘সি’ গ্রুপে সব দলের ৩টি করে ম্যাচ শেষে ৭ পয়েন্ট পেয়ে ব্রাজিলই শীর্ষে অবস্থান করছে। আগামী ২৯ জুন হিউস্টনে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ‘এফ’ গ্রুপের রানার্সআপ দলের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে সুইডেন, জাপান বা নেদারল্যান্ডসের মতো যেকোনো শক্তিশালী দল। অন্যদিকে, মরক্কোও ৭ পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় গ্রুপের রানার্সআপ দল হিসেবে নকআউটে উঠেছে। ৩ পয়েন্ট পাওয়া স্কটল্যান্ডের বিদায় এখনো ১০০% নিশ্চিত হয়নি, তাদের এখন তৃতীয় সেরা দল হিসেবে নকআউটে ওঠার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। আর ০ পয়েন্ট পাওয়া হাইতির বিদায় আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে।
ম্যাচে ভিনিসিয়ুস হ্যাটট্রিকও পেতে পারতেন। কিন্তু ২২ মিনিটে তাঁর করা একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল করে দেয় ভিএআর (VAR)। বল কেড়ে নেওয়ার আগে পেছন থেকে স্কটিশ ডিফেন্ডার জ্যাক হেনড্রাইকের পায়ে হালকা আঘাত করেন ভিনি। ভিডিও রিপ্লেতে এমন দেখা গেলেও সেটা গোল বাতিলের মতো বড় অপরাধ ছিল কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল ভক্তদের মধ্যে বেশ প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভিনির পারফরম্যান্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ব্রাজিলের আক্রমণভাগের আসল নেতা তো এই ভিনিই!
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও তাঁকে ঠিক এই নেতার ভূমিকাতেই দেখা গেল। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটে তাঁর করা প্রথম গোলে স্কটিশ রক্ষণভাগের মারাত্মক ভুল ছিল। ব্রাজিলের তরুণ উইঙ্গার রায়ান স্কটল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাক স্কট ম্যাকেনাকে প্রবল চাপে ফেলেন। ম্যাকেনা বলটি ঠিকমতো ‘ক্লিয়ার’ করতে না পারায় বলের দখল নিয়ে খুব সহজেই গোল করেন ভিনি। এই গোলটি স্কটিশদের ভুলের ‘উপহার’ হলেও সে সময়ে ভিনি আসলে বক্সে ভীষণ তৎপর থাকার পুরস্কারটাই পেয়েছেন।
প্রথমার্ধের যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে ভিনি তাঁর দ্বিতীয় গোলটি পান ব্রুনো গিমারাইসের দারুণ এক ক্রস থেকে। লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত এক হেডে গোলটি করেন তিনি। গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচ খেলে ভিনির গোলসংখ্যা এখন ৪টি। এরপর ৬০ মিনিটে একটি চমৎকার দলীয় আক্রমণ থেকে ম্যাচের তৃতীয় গোলটি করেন ইনফর্ম ৯ নম্বর স্ট্রাইকার কুনিয়া। সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এই পারফরম্যান্স নকআউট পর্বের আগে বাকি দলগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা দিয়ে রাখল।














