দেশকে মাদকমুক্ত করতে এবং যুবসমাজকে এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে প্রশাসন। এরই একটি বড় অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে ৪০০ গ্রাম গাঁজাসহ এক নারী মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। রবিবার, ১৪ জুন দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার অন্তর্গত নিমগাছী গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ওই নারীর নাম মোসা. বেবি। তার বয়স ৪৮ বছর এবং তিনি ওই নিমগাছী গ্রামেরই স্থায়ী বাসিন্দা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় থেকে এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। ডিএনসি সূত্র জানায়, তাদের কাছে আগে থেকেই একটি গোপন ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য খবর ছিল যে, নিমগাছী গ্রামের একটি বাড়িতে গোপনে মাদকের বড় কারবার চলছে। এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিএনসির একটি চৌকস দল রবিবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে ৩টা পর্যন্ত ওই বাড়িতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় মোসা. বেবির সেমিপাকা চার কক্ষবিশিষ্ট বসতবাড়িতে পুলিশ ও ডিএনসি সদস্যরা ব্যাপক তল্লাশি চালান।
তল্লাশির একপর্যায়ে বাড়ির পশ্চিমমুখী শয়নকক্ষের দক্ষিণ পাশে রাখা একটি আলনার দিকে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। সেখানে ঝুলানো একটি সাধারণ শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে তারা বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করেন। উদ্ধার করা আলামতগুলোর মধ্যে ছিল নীল রঙের পলিথিন ও কাগজে মোড়ানো ছোট-বড় মোট ১৩০টি গাঁজার পুড়িয়া। মাদক কারবারিরা সাধারণত খুচরা বিক্রির সুবিধার জন্যই গাঁজাগুলো এভাবে ছোট ছোট পুড়িয়া করে রাখে। ওজন করে দেখা যায়, উদ্ধার করা এসব গাঁজার মোট পরিমাণ ঠিক ৪০০ গ্রাম। বর্তমান কালোবাজারে এই পরিমাণ গাঁজার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২ হাজার টাকা বা ১০০$ (ডলার) এর কাছাকাছি।
এই বয়সে এসে একজন নারীর এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আজকাল অনেক অপরাধী চক্র পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গ্রামের বয়স্ক নারী বা শিশুদের মাদকের বাহক বা বিক্রেতা হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ, সাধারণ মানুষ বা পুলিশ তাদের সহজে সন্দেহ করে না। এই মাদক বিক্রির মাধ্যমে তারা হয়তো দৈনিক ৫বা১০(ডলার) লাভ করে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ। গ্রামের খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানেরা অনেক সময় কৌতূহলবশত এসব মাদক সেবন শুরু করে এবং একসময় পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়ে।
এই সফল অভিযানের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি জানান, উদ্ধার করা সব মাদকদ্রব্য ঘটনাস্থল থেকেই জব্দ করে সিলগালা করা হয়েছে এবং আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ডিএনসির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মুস্তাফিজুর রহমান নিজে বাদী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছেন। গ্রেপ্তার হওয়া নারীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হতে পারে, যাতে এই গাঁজা তিনি কোথা থেকে এনেছেন তা জানা যায়।
উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান আরও বলেন, “মাদক নির্মূল করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তাই আমাদের এই সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিতভাবে চলমান থাকবে। মাদক কারবার এবং মাদকের অপব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও সমানতালে অব্যাহত থাকবে।” তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকেও মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার এবং প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানান।
ডিএনসির এই সফল অভিযানে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা মনে করছেন, এই অভিযানের ফলে স্থানীয়ভাবে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এলাকার সচেতন নাগরিকরা আশা করেন, প্রশাসন যদি এমন কড়াকড়ি অব্যাহত রাখে, তবে খুব শিগগিরই এলাকা থেকে মাদকের অভিশাপ চিরতরে দূর হবে। তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, প্রতিটি পরিবারকেও তাদের সন্তানদের ব্যাপারে আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।
















