মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শৈলকুপা থানা পুলিশ একটি সফল ও সাহসী অভিযান চালিয়েছে। শৈলকুপা পৌর এলাকার ফাজিলপুর গ্রাম থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ মুন্না শেখ নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করেছে তারা। পুলিশের এই সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।
আটককৃত তরুণ মাদক কারবারির পরিচয় নিশ্চিত করেছে শৈলকুপা থানা পুলিশ। তার নাম মুন্না শেখ এবং তার পিতার নাম মনিরুল শেখ। তার গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা পৌর এলাকার ফাজিলপুরে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে একজন তরুণের এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক ও হতাশ করেছে। এই বয়সে তার হাতে বই-খাতা থাকার কথা, মাঠে খেলাধুলা করার কথা, কিন্তু সে টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছে এই মরণনেশার ব্যবসায়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আজকাল অনেক অপরাধী চক্র পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গ্রামের এমন উঠতি বয়সী তরুণদের মাদকের বাহক বা বিক্রেতা হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ, সাধারণ মানুষ বা পুলিশ তাদের সহজে সন্দেহ করে না।
ঘটনার দিন পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, ফাজিলপুর গ্রামের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একজন তরুণ মাদক কারবারি গাঁজা কেনাবেচার জন্য অবস্থান করছে। খবর পাওয়ার পরপরই শৈলকুপা থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ফারুকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় সাধারণ পোশাকে ওত পেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর মুন্না শেখ সেখানে পৌঁছালে পুলিশের সন্দেহ হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাকে দৌড়ে ধরে ফেলেন। এরপর তার শরীর তল্লাশি করে একটি পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার গাঁজা বা ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। এই মাদক বিক্রির মাধ্যমে তারা হয়তো দৈনিক ৫বা১০(ডলার) লাভ করে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ। গ্রামের খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানেরা অনেক সময় কৌতূহলবশত এসব মাদক সেবন শুরু করে এবং একসময় পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়ে।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
শৈলকুপা থানা পুলিশ জানিয়েছে, আটক মুন্না শেখের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের কাজ শুরু করেছে। তার পেছনে এলাকার আরও কোনো বড় হোতা বা গডফাদার আছে কি না, তা বের করতে পুলিশ তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইবে, যাতে এই গাঁজার মূল চালান কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এর আসল সরবরাহকারী, সেই প্রকৃত তথ্য বের করে আনা যায়।
ফাজিলপুর গ্রামের মতো একটি জনবহুল এলাকায় এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় অভিভাবকরা এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই তরুণ কারবারি পুলিশের হাতে আটক হওয়ায় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা পুলিশের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশ বদ্ধপরিকর।
















