দীর্ঘদিনের অধরা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ বা ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আগামী শনিবার মাঠে নামছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সাধারণত ব্রাজিল সব সময় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামে, কিন্তু এবার তাদের ঘিরে এক অন্যরকম অস্বস্তি ও দুর্বলতা কাজ করছে। আর তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে প্রথম ম্যাচেই সামনে দাঁড়িয়ে আছে গত বিশ্বকাপের চমক দেখানো ভয়ংকর দল মরক্কো। অনেকেই ধারণা করছেন, এই ম্যাচেই হয়তো এবারের বিশ্বকাপের প্রথম বড় অঘটন ঘটতে পারে।
ব্রাজিলের এই অস্বস্তির পেছনের কারণগুলো বেশ স্পষ্ট। দলের একটি লম্বা ইনজুরি তালিকা, গত কয়েক বছরের চরম অস্থিরতা এবং বিশ্ববিখ্যাত কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নতুন যুগের শুরু সব মিলিয়ে গ্রুপ সি-এর এই উদ্বোধনী ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অন্য বড় দলগুলো যেখানে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে টুর্নামেন্ট শুরু করার সুযোগ পায়, সেখানে ব্রাজিলকে এমন একটি দলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যারা বিশ্ব ফুটবলের পুরোনো হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে বেশ নাম কামিয়েছে।
গত কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে তারা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার এক ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছিল। সেই জাদুকরি যাত্রায় তারা স্পেন ও পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোকে বিদায় করে দিয়েছিল। তাদের কৌশলগত শৃঙ্খলা, জমাট রক্ষণভাগ এবং ভয়ডরহীন ফুটবল সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। চার বছর আগে তাদের সেই সাফল্যকে অনেকেই রূপকথার গল্প ভেবেছিল, কিন্তু মরক্কো প্রমাণ করেছে যে তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত দলগুলোর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে প্রস্তুত।
মরক্কোর বর্তমান স্কোয়াডও বেশ শক্তিশালী। তাদের দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা স্পেন ও ফ্রান্সের বড় বড় লিগে নিয়মিত খেলেন। ফলে তাদের মধ্যে দারুণ প্রযুক্তিগত মান ও বড় ম্যাচ খেলার বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বিশ্বকাপের আগে মরক্কোর প্রস্তুতিও খুব একটা মসৃণ ছিল না। ঘরের মাঠে সেনেগালের কাছে আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে হেরে তাদের হৃদয় ভেঙেছিল। যদিও পরে একটি পেনাল্টি নিয়ে সেনেগালের ওয়াকআউটের কারণে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এছাড়া বিশ্বকাপের মাত্র ৩ মাস আগে তাদের সফল কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই দায়িত্ব ছেড়ে দেন। তার জায়গায় আসেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ ওয়াহবি, যিনি গত বছর মরক্কোকে চিলিতে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতিয়েছিলেন।
ইনজুরির সমস্যা মরক্কো দলেও আছে। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় নায়েফ আগুয়ের্দ এবং আবদে এজ্জালজুলি ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে ছিটকে গেছেন। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায়, ব্রাজিলের সমস্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। রিয়াল মাদ্রিদের সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ অভিষেক হতে যাচ্ছে এক বিশাল মেডিকেল সংকটের মধ্য দিয়ে। চোটের কারণে রদ্রিগো, এস্তেভাও, এদের মিলিতাও এবং ওয়েসলির মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়রা মাঠে নামতে পারবেন না। দলের সবচেয়ে বড় তারকা নেইমারও পায়ের পেশির ইনজুরিতে ভুগছেন এবং কবে তিনি পুরো ফিট হয়ে মাঠে ফিরবেন, তা এখনো ১০০% নিশ্চিত নয়।
এত চোটের পরও ব্রাজিলের লাইনআপে যথেষ্ট মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছেন। রক্ষণের কেন্দ্রে মার্কিনিওস এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস দারুণ ভরসা দিচ্ছেন। অন্যদিকে আক্রমণভাগের পুরো দায়িত্ব এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাঁধে। আনচেলত্তির অধীনে রিয়াল মাদ্রিদে তিনি দারুণ ফর্মে আছেন। কিন্তু তারপরও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। মিলিতাও এবং ওয়েসলির অনুপস্থিতিতে রাইট ব্যাক পজিশন নিয়ে কোচকে বেশ ভুগতে হচ্ছে। সেখানে দানিলো এবং ইবানেজকে খেলানোর চিন্তা চলছে, এমনকি মিডফিল্ডার এদেরসনকেও সেখানে ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। গত তিন বছরে চারজন ভিন্ন কোচ এবং বারবার ব্যর্থতার কারণে ব্রাজিল এখনো তাদের সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাস ও দাপট ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম করছে।
ব্রাজিলের এই অনিশ্চয়তাই মরক্কোকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। আটলাস লায়ন্স নামে পরিচিত মরক্কো বিশৃঙ্খলার মধ্যেও দারুণ খেলতে পারে। তারা খুব গভীরে নেমে রক্ষণ সামলাতে ভালোবাসে এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হতাশ করে তাদের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল আদায় করতে ওস্তাদ। ব্রাজিলের হয়তো অনেক বড় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত তারকা খেলোয়াড় আছে, কিন্তু মরক্কো আগেই প্রমাণ করেছে যে তারা এসবের কোনো কিছুকেই ভয় পায় না।
ব্রাজিল সাধারণত কোনো বিশ্বকাপে এতটা নীরবে আসে না। কিন্তু এবার তাদের নিয়ে প্রত্যাশা কিছুটা কম এবং প্রশ্ন অনেক বেশি। মরক্কোর সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ প্রমাণ করা যে কাতার বিশ্বকাপের সাফল্য কোনো হঠাৎ পাওয়া অলৌকিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি তাদের নতুন বাস্তবতা। যদি তারা শনিবারের এই মিশনে সফল হয়, তবে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শুরুতেই এক বিশাল ধাক্কা খাবে।
















