ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো শৈলকুপা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার সাধারণ মানুষের একটি বড় আক্ষেপের জায়গা ছিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল দশা এবং দালালদের চরম দৌরাত্ম্য। সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা না পেয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছিলেন। সেই সাথে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছিল। কিন্তু বর্তমানে শৈলকুপার এই হতাশার চিত্রটি খুব দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান-এর মাসিক সমন্বয় মিটিংয়ের পরই শৈলকুপায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর কড়া নির্দেশনার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন দালালমুক্ত হয়েছে, চিকিৎসার মান বেড়েছে এবং এর পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিও অনেক মজবুত হতে শুরু করেছে।
মাসিক সমন্বয় সভার গুরুত্ব ও কঠোর নির্দেশনা
সাধারণত সরকারি অফিসগুলোতে মাসিক মিটিং বা সভা একটি নিয়মিত রুটিন কাজ। অনেক সময়ই এসব মিটিংয়ে শুধু আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। কিন্তু আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান-এর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত শৈলকুপার সাম্প্রতিক মাসিক মিটিংটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি সেখানে কোনো গতানুগতিক কথা বলেননি। তিনি সরাসরি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের হয়রানির বিষয়ে তিনি কঠোর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর এই স্পষ্ট ও জিরো টলারেন্স নীতির কারণেই মিটিং শেষ হতে না হতেই মাঠ পর্যায়ে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দালাল চক্রের মূলোৎপাটন
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল দালাল চক্র। গ্রাম থেকে কোনো অসহায় রোগী এলেই এই দালালরা তাদের ভুল বুঝিয়ে বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যেত। সেখানে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। কিন্তু আইনমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পর উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। এর ফলে দীর্ঘদিনের শিকড় গেড়ে বসা দালাল চক্রটি মুহূর্তের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে পালাতে বাধ্য হয়। বর্তমানে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ সম্পূর্ণ দালালমুক্ত। রোগীরা এখন কোনো ভয় বা হয়রানি ছাড়াই সরাসরি ডাক্তারের কক্ষে যেতে পারছেন।
চিকিৎসা সেবার অভাবনীয় মানোন্নয়ন
দালালমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসা সেবার মানও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। আগে অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সময়মতো হাসপাতালে না আসার অভিযোগ ছিল। কিন্তু এখন চিকিৎসকরা নিয়মিত ও সঠিক সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত থাকছেন। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ সব জায়গাতেই সেবার মান বেড়েছে। রোগীদের সাথে নার্স ও স্টাফদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। হাসপাতালের ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অনিয়ম ছিল, তা দূর করে প্রকৃত রোগীদের হাতে বিনামূল্যে ওষুধ তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে সরকারি হাসপাতালের প্রতি হারানো আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে।
স্বাস্থ্যসেবার সাথে গ্রামীণ অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক
অনেকেই ভাবতে পারেন, হাসপাতালের সেবার সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক কী? আসলে এই সম্পর্কটা অত্যন্ত গভীর। একজন গরিব কৃষক বা ভ্যানচালক যখন অসুস্থ হয়ে সরকারি হাসপাতালে যান এবং বিনা খরচে ভালো চিকিৎসা পান, তখন তার পকেটের হাজার হাজার টাকা বেঁচে যায়। আগে দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে এই মানুষগুলোকে জমিজমা বা হালের বলদ বিক্রি করে চিকিৎসার বিল মেটাতে হতো। এখন সেই বেঁচে যাওয়া টাকা দিয়ে তারা নিজেদের পরিবারের জন্য ভালো খাবার কিনছেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় খরচ করছেন বা নিজেদের ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। এভাবেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি পরোক্ষভাবে মানুষের ব্যক্তিগত অর্থনীতিকে মজবুত করছে।
স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতির সঞ্চার
শুধু স্বাস্থ্য খাতই নয়, আইনমন্ত্রীর মাসিক মিটিংয়ের পর শৈলকুপার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দলাদলির কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা যে আতঙ্কের মধ্যে থাকতেন, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ায় হাটে-বাজারে কেনাবেচা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। কৃষকরা এখন সার বা বীজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না এবং নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিয়ে নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারছেন। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় নতুন নতুন ছোট উদ্যোক্তারাও নির্ভয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
শৈলকুপার এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া। আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দুর্নীতি বা দায়িত্ব অবহেলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই বার্তার পর উপজেলা প্রশাসনের প্রতিটি দপ্তর এখন অনেক বেশি সতর্ক ও জনবান্ধব হয়েছে। শুধু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়, ভূমি অফিস থেকে শুরু করে অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও সাধারণ মানুষ এখন সহজে সেবা পাচ্ছেন। ওপর মহলের সঠিক তদারকি থাকলে যে তৃণমূল পর্যায়ের চিত্র জাদুর মতো বদলে যেতে পারে, শৈলকুপার বর্তমান অবস্থাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
মডেল উপজেলা গড়ার পথে শৈলকুপার অগ্রগতি
শৈলকুপাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি আধুনিক, সংঘাতমুক্ত ও উন্নত মডেল উপজেলা পাওয়ার। বর্তমান এই পরিবর্তনগুলো সেই স্বপ্ন পূরণেরই প্রথম ধাপ। একটি সমাজের স্বাস্থ্যসেবা যখন নিশ্চিত হয় এবং মানুষের অর্থনৈতিক ভিত যখন মজবুত থাকে, তখন সেই সমাজ এমনিতেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আইনমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপজেলা প্রশাসনের এই আন্তরিক প্রচেষ্টা যদি অব্যাহত থাকে, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শৈলকুপা পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল উপজেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, একটি সফল ও ফলপ্রসূ মিটিং কীভাবে হাজারো মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান-এর মাসিক মিটিংটি তার এক চমৎকার উদাহরণ। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আজ দালালমুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নের ফলে গরিব মানুষের পকেটের টাকা বাঁচছে এবং সেই টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এলাকার ব্যবসায়িক ও কৃষিজ কর্মকাণ্ডে যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, তা সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। আমরা আশা করি, উন্নয়নের এই চমৎকার ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। আইনমন্ত্রীর এই মহতী উদ্যোগ এবং প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এভাবেই শৈলকুপাকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যবান উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলবে এটাই আমাদের সবার একান্ত প্রত্যাশা।
















