হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণা ট্রাম্পের, তবে জাহাজ চলাচলে মাইন ও নিরাপত্তার শঙ্কা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে লেখেন যে, হরমুজ প্রণালি সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তিনি জাহাজ মালিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিশ্বের সব জাহাজ, ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ শুরু হোক!” কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিবিসি ভেরিফাই এবং জাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেরিনট্রাফিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চুক্তির ঘোষণার পর এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে মাত্র ৭টি জাহাজ পার হয়েছে। অথচ উপসাগরীয় এলাকায় এখনো প্রায় ৫৮০টির মতো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য আটকে আছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই তেহরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই পথটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি লাইফলাইন। কারণ, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০% বা এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। মঙ্গলবার মেরিনট্রাফিকের তথ্যে দেখা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে ২৫০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার ও ৩৩০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে দেখা যায়, আটকে থাকা জাহাজের প্রায় ৭৫% সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনালের কাছে জড়ো হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত শুরুর আগের মতো জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পথে নিরাপত্তা, সমুদ্রে পোঁতা মাইন এবং টোল বা মাশুল আদায়ের মতো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে।

নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি এখন জাহাজ মালিকদের কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের মার্টিন কেলির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নিতে একজন ক্যাপ্টেনকে ভীষণ সাহসী হতে হবে। কারণ গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান প্রণালি অবরুদ্ধ করার পর থেকে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলেই তারা সরাসরি গুলি ছুড়েছে। অন্যদিকে গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। নির্দেশ অমান্য করায় তারা ৯টি জাহাজকে অচল করে দেয় এবং কয়েকটি জাহাজে মিসাইল হামলাও চালায়। যদিও ট্রাম্প অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন, তবে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। তাই কোনো ক্যাপ্টেনই এখন প্রথম জাহাজ নিয়ে বের হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর বাধা হলো মাইন। যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইরান হুমকি দিয়েছিল যে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা উপসাগরে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি সিনেট কমিটিকে জানান যে, ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালির বিশাল অংশে মাইন পুঁতে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিনগুয়েজ জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে সবার আগে এই মাইনগুলো অপসারণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মাইন অপসারণের কাজ বেশ ধীরগতির হবে। একটি নিরাপদ চ্যানেল বা পথ পরিষ্কার করতে ৩০ দিন থেকে শুরু করে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মাইন অপসারণকারী দলগুলোকে খুব ধীরগতিতে, সম্ভবত ২ বা ৩ নট বেগে এগোতে হবে, যাতে তারা পানির নিচের পরিস্থিতি ভালোভাবে জরিপ করতে পারে।

মাইন ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে টোল বা ফি আদায়ের শঙ্কা। ঐতিহাসিকভাবেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিনা খরচে অবাধে জাহাজ চলাচল করে আসছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে ইরান এই প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে এবং ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ গঠন করে। তারা জানিয়েছিল, এই কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচলে নিরাপদ পারাপারের অনুমতিপত্র ইস্যু করবে এবং এর জন্য ফি নেবে। ট্রাম্প যদিও বলেছেন প্রণালিটি ‘টোল ফ্রি’ বা বিনা মাশুলে খুলে দেওয়া হবে, কিন্তু ইরানের বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, নতুন চুক্তি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালিটি ইরানই পরিচালনা করবে এবং জাহাজগুলোর ওপর ‘সার্ভিস ফি’ বসানো হতে পারে।

আগামী শুক্রবার এই শান্তি চুক্তিতে সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পর হয়তো এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর পরিষ্কার হবে। তবে কেপলারের বিশ্লেষক দিমিত্রিস অ্যাম্পাৎজিদিস মনে করেন, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণালিটি হয়তো খুব দ্রুতই খুলে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থা ১০০% স্বাভাবিক হতে এবং সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস ফিরে আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান এর মাসিক মিটিং এর পরই শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন দালাল মুক্ত করুন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ভীত মজবুত হতে শুরু করেছে