ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী ইউনিয়নের রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামে রাতের অন্ধকারে এক ভয়ংকর ও দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটেছে। চোরেরা একটি বাড়ির জানালার গ্রিল কেটে এবং ছাদের গেটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে নগদ টাকা ও দামি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে। এই চুরির কারণে গ্রামের সাধারণ এক কৃষক পরিবার তাদের সারা জীবনের জমানো সম্পদ হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে শুরু করে বুধবার ভোর ৫টার মধ্যে যেকোনো সময় এই পরিকল্পিত চুরির ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনার পর পুরো রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামে এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
চুরির শিকার হওয়া এই বাড়িটি রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বিশ্বাসের ছেলে শান্তি বিশ্বাসের। শান্তি বিশ্বাস এলাকায় একজন সাধারণ ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত। ভুক্তভোগী পরিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জানান, চোরেরা অত্যন্ত সুকৌশলে প্রথমে বাড়ির পেছনের দিকের একটি জানালার লোহার গ্রিল কেটে ফেলে। এরপর তারা সেই কাটা অংশ দিয়ে ছাদে ওঠে এবং ছাদের ভারী গেটের তালা ভেঙে সরাসরি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। চোরেরা খুব ভালো করেই জানত যে বাড়ির পেছনের দিকে মানুষের নজরদারি কম থাকে।
ঘরের ভেতরে ঢোকার পর চোরের দল পুরো বাড়ি রীতিমতো তছনছ করে ফেলে। তারা ঘরের আলমারি ও ওয়ারড্রোবের লকার ভেঙে ভেতরে রাখা মূল্যবান সব জিনিসপত্র বের করে নেয়। শান্তি বিশ্বাস জানান, চোরেরা তার বাড়ি থেকে প্রায় ১ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার লুট করেছে। চুরি যাওয়া এই স্বর্ণালংকারের মধ্যে ছিল একটি গলার চেইন, ৪ জোড়া কানের দুল, ৫ জোড়া ছোট দুল, ২ জোড়া হাতের রুলি, ৪টি আংটি এবং ১টি ব্রেসলেট। বর্তমান বাজারে এক ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বা প্রায় ১,০০০$ (ডলার) এর সমান। পরিবারের নারীদের অনেক শখ ও কষ্টের জমানো এই গয়নাগুলো হারিয়ে তারা এখন বাকরুদ্ধ।
স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি চোরেরা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থও নিয়ে গেছে। শান্তি বিশ্বাস কিছুদিন আগে তার পালিত কয়েকটি গরু বিক্রি করেছিলেন। সেই গরু বিক্রির নগদ ২ লাখ টাকা তিনি ভবিষ্যতের জন্য আলমারিতে সযত্নে জমিয়ে রেখেছিলেন। চোরেরা সেই নগদ ২ লাখ টাকা এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত দুটি দামি স্মার্টফোনও সাথে করে নিয়ে যায়। নগদ টাকা, স্বর্ণ ও মোবাইল মিলিয়ে শান্তি বিশ্বাসের পরিবারের মোট প্রায় ৩.৫ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা তাদের মতো একটি সাধারণ পরিবারের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।
এই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুরো রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামে মানুষের মধ্যে একধরনের চাপা ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ এখন রাতে শান্তিতে ঘুমাতে ভয় পাচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু শান্তি বিশ্বাসের বাড়িই নয়, গত কয়েক মাসে রাঙ্গিয়ারপোতা এবং এলাঙ্গী ইউনিয়নের আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও চুরির খবর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু অপরাধীরা ধরা না পড়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয়রা মনে করেন, এলাকায় মাদকাসক্ত তরুণ ও কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াই এই চুরি বাড়ার প্রধান কারণ। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা রাতের অন্ধকারে মানুষের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা জানান, আগে গ্রামে পাহারাদার বা চৌকিদাররা নিয়মিত টহল দিতেন, কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। তারা কোটচাঁদপুর থানা পুলিশের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, রাতে যেন পুলিশি টহল অন্তত ৫০% থেকে ৬০% বৃদ্ধি করা হয় এবং এই চোর চক্রটিকে ধরতে দ্রুত সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যও বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এমন চুরির ঘটনা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করছে। তিনি পুলিশ প্রশাসনের কাছে দ্রুত এই অপরাধী চক্রটিকে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী শান্তি বিশ্বাস তার চুরি যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়ার আশায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত এই চোর চক্রটিকে ধরে শান্তি বিশ্বাসের হারানো সম্পদ উদ্ধার করতে পারে।
















