বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বজুড়ে এক অন্যরকম উন্মাদনা, আবেগ আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও বেজে উঠেছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের দামামা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাটিতে যৌথভাবে আয়োজিত হচ্ছে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’। জুন মাসের এই সময়ে সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন উত্তর আমেরিকার অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামগুলোর দিকে। ফুটবল শুধুমাত্র ২২ জনের একটি খেলা নয়; এটি হাসি, কান্না, উল্লাস এবং ইতিহাস তৈরির এক মহাকাব্য। এবারের বিশ্বকাপটি আগের যেকোনো আসরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং রোমাঞ্চকর। কারণ, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ।
মাঠে বল গড়ানো মাত্রই চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব জায়গায় একটাই প্রশ্ন, “ফিফা ওর্য়া’ল্ড কাপ ২০২৬ কার ভাগ্যে যাবে?” লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা কি পারবে তাদের মুকুট ধরে রাখতে? নাকি ব্রাজিল তাদের ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা ঘরে তুলবে? কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স কি কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের আক্ষেপ ঘোচাবে, নাকি ইংল্যান্ডের তরুণ সোনালী প্রজন্ম অবশেষে তাদের দেশে ট্রফি ফিরিয়ে আনবে? এমন হাজারো প্রশ্ন আর সমীকরণ এখন ফুটবল ভক্তদের মনে। বর্তমান পরিস্থিতি, দলগুলোর শক্তি, নতুন ফরম্যাট এবং খেলোয়াড়দের ফর্ম বিশ্লেষণ করে চলুন একটি ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করি, এবারের বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি কার হাতে উঠতে পারে।
উত্তর আমেরিকায় ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ এবং নতুন ফরম্যাট
বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে এবারের বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ফরম্যাট পরিবর্তনের কারণে এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথটি আরও বেশি দীর্ঘ এবং কঠিন হয়েছে। আগের ৩২ দলের পরিবর্তে এবার খেলছে ৪৮টি দেশ। দলগুলোকে ৪টি করে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা ৮টি দল উঠবে নকআউট পর্বে বা ‘রাউন্ড অফ ৩২’-এ।
অর্থাৎ, আগে যেখানে গ্রুপ পর্বের পর সরাসরি শেষ ষোলোর লড়াই শুরু হতো, সেখানে এবার চ্যাম্পিয়ন হতে হলে একটি দলকে আটটি ম্যাচ খেলতে হবে, যা আগে ছিল সাতটি। মোট ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরের আবহাওয়ায় এবং উচ্চতায় এতগুলো ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের ফিটনেসের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। যে দলের বেঞ্চ স্ট্রেংথ বা সাইডবেঞ্চে ভালো মানের বদলি খেলোয়াড় বেশি থাকবে, লম্বা এই টুর্নামেন্টে তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে।
শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার যারা
যেকোনো বিশ্বকাপেই কিছু নির্দিষ্ট দল ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামে। দলের বর্তমান ফর্ম, খেলোয়াড়দের মান এবং কোচের ট্যাকটিকস সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের শিরোপার প্রধান দাবিদারদের নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা: মুকুট ধরে রাখার মিশন
লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা বর্তমানে এক অপ্রতিরোধ্য দলে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয় এবং পরবর্তীতে কোপা আমেরিকায় তাদের ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে যে তারা কতটা সংঘবদ্ধ। লিওনেল মেসি নামক এক জাদুকর এখনও এই দলের প্রাণভোমরা। বয়স বাড়লেও মাঠে তার ভিশন, পাসিং এবং খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি।
তবে শুধু মেসি নয়, বর্তমান আর্জেন্টিনা দল আর কোনো একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এক আস্থার প্রতীক। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পলের মতো লড়াকু ফুটবলাররা আছেন, যারা প্রতিপক্ষকে মুহূর্তের মধ্যে চাপে ফেলতে পারেন। আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজ অসাধারণ ছন্দে আছেন। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের টিম কেমিস্ট্রি বা দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া। তবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয় করা ইতিহাসে খুব বিরল ঘটনা, তাই আর্জেন্টিনার জন্য পথটি সহজ হবে না।
তারকায় ঠাসা ফ্রান্স ও কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি
বিশ্বকাপ জেতার অন্যতম প্রধান ফেভারিট হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ফ্রান্সকে তালিকার উপরের দিকেই রাখেন। দিদিয়ের দেশমের এই দলটি গত টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে (২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালে রানার্সআপ)। ফ্রান্স দলের দিকে তাকালে মনে হয় যেন তারা একঝাঁক তারকার মেলা। দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র অবশ্যই কিলিয়ান এমবাপ্পে। নিজের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থাকা এই ফরোয়ার্ড তার গতি এবং ফিনিশিং দিয়ে যেকোনো দলের রক্ষণভাগ একাই গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এমবাপ্পের পাশাপাশি অরেলিয়েন চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ওসমান ডেম্বেলে এবং উইলিয়াম সালিবাদের মতো তরুণ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা দলে অসাধারণ ভারসাম্য এনে দিয়েছেন। ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাদের বেঞ্চ স্ট্রেংথ। প্রথম একাদশের কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়লে তার বদলি হিসেবে বিশ্বমানের আরেকজন খেলোয়াড় প্রস্তুত থাকে। যদি তারা নিজেদের ইগো বা দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়িয়ে চলতে পারে, তবে ফ্রান্সকে ঠেকানো প্রায় অসম্ভব।
হেক্সা জয়ের মিশনে ব্রাজিল: ২৪ বছরের অপেক্ষা
ফুটবল এবং ব্রাজিল যেন একে অপরের সমার্থক শব্দ। ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মাঠে নামলে পুরো বিশ্ব তাদের সাম্বা ছন্দ দেখার জন্য মুখিয়ে থাকে। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের ট্রফিটি আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি সেলেসাওদের। প্রতিবারই দুর্দান্ত দল নিয়ে গিয়েও কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনালে তাদের হোঁচট খেতে হয়েছে। ২০২৬ সালে ব্রাজিল কি পারবে এই আক্ষেপ ঘোচাতে?
বর্তমান ব্রাজিল দলের আক্রমণভাগ বিশ্বের অন্যতম সেরা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রদ্রিগো এখন নিজেদের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ কাঁপাচ্ছেন। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতিশীল খেলা ব্রাজিলের বড় ভরসা। এছাড়া এন্ড্রিকের মতো নতুন প্রজন্মের তরুণ বিস্ময় এই দলের শক্তি আরও বাড়িয়েছে। তবে ব্রাজিলের মূল সমস্যা হলো ইউরোপিয়ান ট্যাকটিকাল বা গোছানো ফুটবলের সামনে অনেক সময়ই তারা খেই হারিয়ে ফেলে। যদি মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগের দুর্বলতা কোচ দোরিভাল জুনিয়র বা বর্তমান কোচিং স্টাফরা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তবে ২৪ বছরের খরা কাটিয়ে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের খুব ভালো সুযোগ রয়েছে।
ইংল্যান্ড: সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে শিরোপা ঘরে ফেরার অপেক্ষা
“ইটস কামিং হোম” বা ‘ফুটবল ঘরে ফিরছে’ এই স্লোগানটি প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে ইংল্যান্ডের সমর্থকরা দিয়ে থাকেন। ১৯৬৬ সালের পর আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ড দলটিকে বলা হচ্ছে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘সোনালী প্রজন্ম’।
জুড বেলিংহামের মতো মিডফিল্ডার, যিনি সারা মাঠে একাই প্রভাব বিস্তার করতে পারেন; ফিল ফোদেন, বুকায়ো সাকার মতো তরুণ প্রতিভাবান উইঙ্গার এবং হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বমানের স্ট্রাইকার ইংল্যান্ড দলকে এক ভীতিকর শক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের স্কোয়াডের প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়ই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে নিয়মিত খেলেন। বিগত কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে তারা খুব কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে (যেমন ইউরো ২০২০-এর ফাইনাল)। এবার তারা সেই মানসিক বাধা অতিক্রম করতে পারলে শিরোপা জয়ের প্রবল দাবিদার।
ইউরোপের অন্যান্য পরাশক্তি ও তাদের সম্ভাবনা
শুধুমাত্র আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা ফ্রান্সের মধ্যেই ফুটবলের লড়াই সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের অন্যান্য বড় দলগুলোও যেকোনো সময় শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
জার্মানি ও স্পেন: তরুণ প্রজন্মের ঝলক
জার্মানি এবং স্পেন উভয় দলই গত কয়েক বছরে নিজেদের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে গেছে। স্পেনের টিকি-টাকা স্টাইল এখন আরও অনেক বেশি গতিশীল। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি এবং নিকো উইলিয়ামসের মতো তরুণ তারকারা স্পেনকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্পেনের পাসিং ফুটবল যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই বিরক্তিকর এবং ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, জার্মানি কখনোই হার না মানা মানসিকতার জন্য পরিচিত। জামাল মুসিয়ালা এবং ফ্লোরিয়ান রিটজের মতো তরুণ জাদুকরদের সাথে অভিজ্ঞদের মিশেলে জার্মানি আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া। একটি গোছানো এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ দল হিসেবে জার্মানিকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ নেই।
পর্তুগাল: ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ
পর্তুগাল এমন একটি দল যাদের প্রতিভায় ভরপুর একটি স্কোয়াড রয়েছে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, রাফায়েল লিয়াও এবং রুবেন দিয়াসের মতো বিশ্বসেরা তারকারা দলে আছেন। আর এর সাথে জড়িয়ে আছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আবেগ। বয়সের ভারে হয়তো আগের সেই ধার কিছুটা কমেছে, কিন্তু বক্সের ভেতরে তিনি এখনও বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফিনিশার। পর্তুগাল যদি তাদের দলের এই অগাধ প্রতিভার সঠিক ব্যবহার মাঠে করতে পারে, তবে তারাও হতে পারে বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার।
ডার্ক হর্স বা চমক দেখাতে প্রস্তুত যারা
প্রতিটি বিশ্বকাপেই কিছু দল থাকে যারা ফেভারিটের তকমা গায়ে না মেখেও সবাইকে চমকে দিয়ে বহুদূর চলে যায়। এবারের বিশ্বকাপে এই তালিকায় সবার ওপরে থাকবে উরুগুয়ে। প্রখ্যাত কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে উরুগুয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং প্রেসিং ফুটবল খেলছে। ফেদে ভালভার্দে এবং ডারউইন নুনেজরা যেকোনো বড় দলের ঘাম ছুটিয়ে দিতে পারেন।
এছাড়া কলম্বিয়াও দারুণ ফর্মে রয়েছে। গত কয়েক বছরে টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়েছে। ইউরোপের নেদারল্যান্ডস কিংবা গতবারের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোও ডার্ক হর্স হিসেবে বড় দলগুলোর জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোও নিজেদের চেনা মাঠ এবং দর্শকদের সমর্থন কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু করার ক্ষমতা রাখে।
বাংলাদেশের দর্শকদের উন্মাদনা ও সমর্থন
ফুটবল বিশ্বকাপের কথা উঠলে বাংলাদেশের কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশ হয়তো বিশ্বকাপে খেলে না, কিন্তু বিশ্বকাপের সময় এই দেশের মানুষের উন্মাদনা সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। জুন-জুলাই মাসের এই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়ির ছাদে ওড়ে প্রিয় দলের পতাকা। চায়ের দোকানে, অফিসে বা ক্লাসরুমে চলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তুমুল তর্ক আর আলোচনা। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে খেলা দেখার এই আনন্দ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি দূর করে দেয়। এবারের বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের কোটি কোটি দর্শক গভীর রাতে জেগে থেকে প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটাবে, যা ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদনেরই এক অনন্য প্রমাণ।
কে হাসবে শেষ হাসি? (বিশ্লেষণ)
এতক্ষণ বিশ্লেষণ করার পর মূল প্রশ্ন হলো, ট্রফিটা আসলে কার হাতে উঠবে? আধুনিক ফুটবল এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করে না। একটি দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে শক্তিশালী রক্ষণভাগ, সৃজনশীল মাঝমাঠ এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের পাশাপাশি প্রচুর শারীরিক ফিটনেসের প্রয়োজন হয়।
নতুন ফরম্যাটে যেহেতু ম্যাচ বেশি, তাই ইনজুরি একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। যে দেশের কোচিং স্টাফরা খেলোয়াড়দের রোটেশন (ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানো) ভালোভাবে করতে পারবেন, তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। কৌশলগত দিক দিয়ে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের স্কোয়াড ডেপথ বা খেলোয়াড়ের সংখ্যাগত মান সবচেয়ে ভালো। তবে লাতিন আমেরিকার দলগুলোর, বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে যে দলীয় আবেগ এবং লড়াকু মানসিকতা দেখা যায়, তা অনেক ট্যাকটিক্সকেই মাঠে হার মানায়।
একদিকে ইউরোপের ট্যাকটিকাল ও ফিজিক্যাল ফুটবল, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার ছন্দময় ও শৈল্পিক ফুটবল এই দুইয়ের লড়াইয়ে কে জিতবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে যদি ফর্ম এবং দলগত শক্তির একটি উপসংহার টানতে হয়, তবে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং ইংল্যান্ড এই চার দলের মধ্যেই মূল শিরোপার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ফুটবল হলো অনিশ্চয়তার এক অপরূপ সুন্দর খেলা। কাগজের কলমের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। মাত্র ৯০ মিনিটের একটি খেলায় যেকোনো মুহূর্তে পাশা উল্টে যেতে পারে। ছোট কোনো দল হয়তো তাদের চেয়ে দশগুণ শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দিয়ে রূপকথার জন্ম দিতে পারে, আর এটাই বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ কার ভাগ্যে যাবে তার উত্তর পেতে আমাদের টুর্নামেন্টের একেবারে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সবুজ গালিচায় যখন একেকটি ম্যাচ গড়াবে, তখন নতুন নতুন গল্পের জন্ম হবে। হয়তো কোনো তরুণ তারকা এই বিশ্বকাপ দিয়ে নিজের জাত চেনাবেন, অথবা কোনো কিংবদন্তি চোখের জলে শেষবারের মতো বিশ্বকাপ মঞ্চকে বিদায় জানাবেন। ট্রফি যার হাতেই উঠুক না কেন, জয় হবে ফুটবলের, জয় হবে এই সুন্দর খেলার। আমরা সাধারণ দর্শকরা এখন শুধু চোখ রাখব টেলিভিশনের পর্দায় এবং উপভোগ করব ফুটবলের এই অবিস্মরণীয় মহাযজ্ঞ।
















