মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার সাধারণ মানুষকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুন মঙ্গলবার শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি যৌথ ও সাহসী অভিযানে মধু দাশ নামের ৩২ বছর বয়সী এক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে গাঁজা সেবনরত অবস্থায় হাতেনাতে আটক করা হয়। এলাকায় সে ‘মাদক সম্রাট’ নামে পরিচিত। আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আটককৃত এই মাদক কারবারির পুরো নাম মধু দাশ। তার পিতার নাম মন্টু দাশ এবং তার গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার বাজার পাড়া এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে সে এই এলাকায় অত্যন্ত দাপটের সাথে মাদকের ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মধু দাশ এলাকার উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবকদের টার্গেট করে অত্যন্ত গোপনে এই মরণনেশার ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষ তার এই অবৈধ ব্যবসার কথা জানলেও, তার ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। সে শুধু নিজেই মাদক সেবন করত না, বরং এলাকার অনেক নিরীহ তরুণকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এই অন্ধকার পথে টেনে এনেছে।
ঘটনার দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। তারা জানতে পারেন যে, বাজার পাড়া এলাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মধু দাশ প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন করছে এবং সেখানে মাদকের আসর বসিয়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই ইউএনও এবং পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মধু দাশ পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাকে দৌড়ে ধরে ফেলেন। এরপর তার শরীর তল্লাশি করে গাঁজা এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
আটকের পরপরই ঘটনাস্থলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। মধু দাশ নিজের অপরাধ স্বীকার করায় এবং হাতেনাতে প্রমাণ মেলায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে গাঁজা সেবনের অপরাধে সরাসরি ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। পুলিশের রেকর্ড ঘেঁটে জানা যায়, এই মধু দাশ কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মোট ৮টি মামলা রয়েছে। বারবার গ্রেপ্তার হলেও সে আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ত। এলাকার মানুষ তাকে ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবেই চেনে। এবার তাকে সরাসরি ৬ মাসের সাজা দেওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার গাঁজা বা ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। এই মাদক বিক্রির মাধ্যমে তারা হয়তো দৈনিক ৫বা১০বা১০(ডলার) লাভ করে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
বাজার পাড়া গ্রামের মতো একটি জনবহুল এলাকায় এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় অভিভাবকরা এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই ‘মাদক সম্রাট’ প্রশাসন ও পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে যাওয়ায় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
















