দেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সব সময়ই অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মাদক বা অন্য কোনো পণ্য দেশে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য তারা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কড়া পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ১৪ জুন ২০২৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন বা ৫৩ বিজিবি-এর অধীনস্থ মনাকষা বর্ডার অবজারভেশন পোস্টের (বিওপি) সদস্যরা দুটি পৃথক ও সফল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছেন। এই জোড়া অভিযানে তারা ভারত থেকে অবৈধভাবে নিয়ে আসা মোট ১৬২ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ করেছেন। তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বিজিবির এমন তৎপরতা সাধারণ মানুষের কাছে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
বিজিবি সূত্র থেকে এই জোড়া অভিযানের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় আজ খুব ভোরে, সকাল ৫টা ১৫ মিনিটে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিজিবির একটি টহল দল শিবগঞ্জ থানাধীন রাণীহাটি ইউনিয়নের কোটালীপাড়া গ্রামে অবস্থান নেয়। সেখানে অভিযান চালিয়ে তারা ৪৪ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় ‘ফেয়ারডিল’ সিরাপ জব্দ করতে সক্ষম হয়। তবে ভোরে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা মাল ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই দিন দুপুর ৩টা ৪৫ মিনিটে ওই একই স্থানে বিজিবি আরেকটি বিশেষ অভিযান চালায়। এবার তারা সেখান থেকে আরও ১১৮ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় ‘এস্কাফ’ সিরাপ জব্দ করে।
মাদক চোরাকারবারিরা সাধারণত সীমান্ত পার করে এসব নেশাজাতীয় সিরাপ দেশের ভেতরের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেয়। তরুণ ও উঠতি বয়সীদের কাছে এসব সিরাপের বেশ চাহিদা রয়েছে এবং তারা এটি নেশার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজকের এই জোড়া অভিযানে জব্দ করা ১৬২ বোতল মাদকদ্রব্যের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৬৫,০০০ টাকার মতো। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এটি হয়তো খুব বেশি নয়, প্রায় ৫৫০$ (ডলার) এর সমান। কিন্তু এই সামান্য টাকার মাদকই সমাজের অনেকগুলো পরিবারকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জব্দ করা এই মালামালগুলো পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়ম মেনে শিবগঞ্জ থানায় জমা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র চলতি জুন মাসেই ৫৩ বিজিবি তাদের আওতাধীন সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদক উদ্ধারে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই মাসের মাত্র দুই সপ্তাহে তারা সর্বমোট ৬২১ বোতল ‘এস্কাফ’ সিরাপ, ৪৪ বোতল ‘ফেয়ারডিল’ সিরাপ এবং ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। এই সব মাদকের মোট বাজার মূল্য প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার ওপরে। চোরাকারবারিরা সাধারণত সীমান্ত এলাকার বেকার ও গরিব যুবকদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এই মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি মাদকের চালান সফলভাবে পার করতে পারলে একজন পাচারকারীকে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বকশিশ দেওয়া হয়। এই সামান্য টাকার লোভে পড়ে তারা নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ দুটোই নষ্ট করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন বা ৫৩ বিজিবির সুযোগ্য অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি গণমাধ্যমের কাছে আজকের এই সফল অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, অবৈধভাবে কোনো পুশ-ইন প্রতিরোধ এবং যেকোনো ধরনের চোরাচালান দমনে বিজিবির প্রতিটি সদস্য সর্বদা সজাগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়নে বিজিবি মাঠে নিরলসভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে”। তিনি আরও জানান, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো অপরাধী চক্র পার পেয়ে না যায়।
সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ বিজিবির এই কঠোর অবস্থান ও ধারাবাহিক অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, প্রশাসন যদি এমন কড়াকড়ি অব্যাহত রাখে, তবে খুব শিগগিরই এলাকা থেকে মাদকের অভিশাপ চিরতরে দূর হবে। তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, প্রতিটি পরিবারকেও তাদের সন্তানদের ব্যাপারে আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।
















