পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনে এখন এক গভীর উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে। দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে যারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে স্কুলে শিক্ষকতা করে আসছেন, তাদের সামনে এখন হঠাৎ করে চাকরি হারানোর বিশাল এক খাঁড়া ঝুলছে। সুপ্রিম কোর্টের একটি নতুন নির্দেশে বলা হয়েছে, কর্মরত শিক্ষকদেরও চাকরি বাঁচাতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট বা ‘টেট’ (TET) পাস করতে হবে। এই নির্দেশকে অত্যন্ত অপমানজনক ও অবাস্তব দাবি করে মঙ্গলবার, ১৬ জুন দুপুরে কলকাতার কলেজ স্কয়ারে বিদ্যাসাগর মূর্তির সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা। ‘টেট অ্যাফেক্টেড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর উদ্যোগে এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি শিক্ষক সংগঠনের সহযোগিতায় এই প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে কলেজ স্কয়ার থেকে এই বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। শত শত শিক্ষক হাতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে হিন্দ সিনেমা হয়ে এস এন ব্যানার্জি রোড ধরে ওয়াই চ্যানেলে গিয়ে মিছিল শেষ করেন। এরপর শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদল তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি বা ডেপুটেশন জমা দেন। এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন টেট অ্যাফেক্টেড টিচার্সের আহ্বায়ক অশোক রুদ্র। এছাড়া সমীর বেরা, দিলীপ মাইতি এবং বাসুদেব দাসসহ অনেক সিনিয়র শিক্ষক নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষক নেতারা তাদের বক্তব্যে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্মরত শিক্ষকদের জন্য এমন বাধ্যতামূলক টেটের নিয়ম আসলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার একটি গভীর চক্রান্ত। সুপ্রিম কোর্ট শিক্ষার মান বা কোয়ালিটি রক্ষার দোহাই দিয়ে এই নির্দেশ দিলেও, প্রবীণ শিক্ষকদের জন্য এটি অত্যন্ত অমর্যাদাকর ও অসম্মানের। একজন শিক্ষক যিনি গত ২৫ বছর ধরে ক্লাসে বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন, তাকে হঠাৎ করে নতুন নিয়মে পরীক্ষা দিতে বলাটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় পুরো শিক্ষক সমাজ এখন চরম আতঙ্ক ও মানসিক হতাশায় ভুগছেন। এমনকি এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ইতিমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিয়েছেন।
এই সমস্যার সূত্রপাত গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায় থেকে। ওই রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, যেসব শিক্ষকের চাকরির বয়স ৫ বছরের বেশি হয়ে গেছে, তাদেরও চাকরি ধরে রাখতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে টেট পাস করতে হবে। এই অবাস্তব নির্দেশের বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে শিক্ষকেরা তুমুল আন্দোলন শুরু করেন। রায় সংশোধনের জন্য সারা দেশের বিভিন্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে মোট ৬৯টি রিভিউ পিটিশন বা আপিল দায়ের করা হয়। দীর্ঘ আট মাস অপেক্ষার পর গত ১৩ মে ওপেন কোর্টে এর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু গত ২৯ মে প্রকাশিত রিভিউ পিটিশনের রায়ে শিক্ষকদের জন্য কোনো সুখবর ছিল না। আদালত আগের রায় বহাল রেখে আগামী ৩১ আগস্ট ২০১৮ সালের মধ্যে টেট পাস করা বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা দেয়।
এই একটিমাত্র রায়ের কারণে পুরো ভারতের প্রায় ৩৩ লাখ শিক্ষক সরাসরি চরম বিপদে পড়েছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেই প্রায় ৯০ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক এখন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। শিক্ষক নেতারা বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, একজন মানুষ শিক্ষকতা পেশায় ২০ থেকে ২৫ বছর পার করার পর তার পক্ষে নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক টেট পরীক্ষায় বসা এবং পাস করা প্রায় অসম্ভব। এই পরীক্ষায় বসলে তাদের অন্তত ৮০% থেকে ৯০% শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই ফেল করবেন। আর তারা ফেল করলে বা চাকরি হারালে স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট দেখা দেবে এবং গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
তাই শিক্ষকদের এখন একটাই আশা, রাজ্য সরকার যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। শিক্ষক নেতারা বলেন, নবনির্বাচিত রাজ্য সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একের পর এক দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। ঠিক তেমনি এই বিশাল মানবিক সমস্যা সমাধানেও তারা দ্রুত উদ্যোগী হবে বলে শিক্ষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। তারা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়কেই শিক্ষা ও শিক্ষক জীবন বিনষ্টকারী এই অমানবিক টেট বাতিল করার জন্য কার্যকরী আইনি ও প্রশাসনিক ভূমিকা গ্রহণের জোর আহ্বান জানান। শিক্ষকরা আশা করছেন, সরকার তাদের এই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সেবার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে এবং তাদের চাকরি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
















