যশোরের চৌগাছায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের স্মার্ট প্রকল্পের কর্মশালা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসাকে আধুনিক রূপ দিতে যশোরের চৌগাছায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের সরাসরি উদ্যোগে এবং বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় এই প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সম্প্রতি শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের চৌগাছা এরিয়া অফিসে ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন’ বা সংক্ষেপে ‘স্মার্ট’ (SMART) প্রকল্পের আওতায় এই স্টেকহোল্ডার লিংকেজ ওয়ার্কশপটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবনমান উন্নত করাই এই আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন। হিসাব করে দেখা যায়, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% আসে এই মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ বা ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, মূলধনের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকায় এসব উদ্যোক্তা অনেক সময় বড় কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। এই বড় সমস্যাটি সমাধানের জন্যই বিশ্বব্যাংক এবং পিকেএসএফ কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বিনিয়োগ করে যুগান্তকারী এই ‘স্মার্ট’ প্রকল্পটি চালু করেছে। প্রকল্পটির প্রধান কাজ হলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব ব্যবসা গড়তে সাহায্য করা এবং যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক ঝুঁকি থেকে তাদের ব্যবসাকে রক্ষা করা।

স্টেকহোল্ডার লিংকেজ ওয়ার্কশপ বা অংশীজনদের সংযোগ কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো পণ্য তৈরি করেন, তখন তিনি সব সময় সরাসরি বড় বাজারে তা বিক্রি করার সুযোগ পান না। এই কর্মশালাটি মূলত স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে বড় বাজারের ক্রেতা, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি একটি সম্পর্ক বা সেতুবন্ধন তৈরি করার কাজ করে। গ্রামে তৈরি হওয়া একটি পণ্য যখন সরাসরি শহরের বড় ক্রেতার কাছে পৌঁছায়, তখন মাঝখানের দালাল বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য একেবারে কমে যায়। এর ফলে একজন উদ্যোক্তার লাভের পরিমাণ অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত এক ধাক্কায় বেড়ে যায়। এই কর্মশালায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের এক ছাদের নিচে এনে সেই কঠিন সংযোগ তৈরির কাজটিই অত্যন্ত সহজে করে দিয়েছে শিশুনিলয় ফাউন্ডেশন।

চৌগাছায় আয়োজিত এই চমৎকার কর্মশালায় এলাকার নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তারা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক এবং শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বক্তারা কীভাবে ছোট ব্যবসাকে বড় করা যায়, কীভাবে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে আধুনিক উপায়ে পণ্য উৎপাদন করা যায়, সে বিষয়ে খুব সহজ ও সাধারণ ভাষায় আলোচনা করেন। উদ্যোক্তারাও কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা না রেখে তাদের ব্যবসার নানা সমস্যা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা মন খুলে উপস্থিত অতিথিদের জানান। সরকারি কর্মকর্তারাও উদ্যোক্তাদের সব ধরনের আইনি ও কারিগরি সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন।

ব্যাংক কর্মকর্তারা এই কর্মশালায় অংশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল লেনদেনের নানা সুবিধা সম্পর্কে ধারণা দেন। তারা জানান, এখন আর ঋণের কিস্তি দিতে বা কাঁচামাল কিনতে পকেটে নগদ টাকা নিয়ে ঘোরার কোনো প্রয়োজন নেই। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই নিরাপদে সব লেনদেন করা যায়, যা উদ্যোক্তাদের সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই বাঁচায়।

এই স্মার্ট প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন পরিশ্রমী নারী উদ্যোক্তারা। গ্রামের অবহেলিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করতে শিশুনিলয় ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। কর্মশালায় অংশ নেওয়া অনেক নারী উদ্যোক্তা জানান, আগে তারা শুধু ঘরের কাজ করতেন এবং অন্যের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এখন তারা পিকেএসএফ-এর সহায়তায় এই প্রকল্পের অধীনে ৫০০থেকেশুরুকরে২,০০০ (ডলার) বা তার সমপরিমাণ সহজ শর্তের ঋণ নিয়ে নিজেদের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছেন। কেউ উন্নত জাতের গরু ও ছাগল পালন করছেন, কেউ নকশিকাঁথা বানাচ্ছেন, আবার কেউবা বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ ও আধুনিক নার্সারি গড়ে তুলেছেন। নিজেদের এই আয় দিয়ে তারা এখন পরিবারের সব খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফ সব সময় চায় দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের এই ব্যবসাগুলো যেন শতভাগ (১০০%) পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হয়। ক্ষতিকর রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ব্যবহার করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক করে ব্যবসা পরিচালনার ওপর তারা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের দক্ষ কর্মীরা নিয়মিত মাঠে গিয়ে উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমে এই বিষয়গুলো শেখাচ্ছেন। স্মার্ট প্রকল্পের নামের মধ্যেই ‘রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন’ বা সহনশীল রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। এর মানে হলো, করোনা মহামারির মতো কোনো হঠাৎ আসা অর্থনৈতিক ধাক্কা বা বন্যা-খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও যেন এই ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো শক্তভাবে টিকে থাকতে পারে।

কর্মশালার শেষ দিকে উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত কিছু চমৎকার পণ্যের নমুনা সবার সামনে প্রদর্শন করেন। এমন একটি দরকারি ও কাজের কর্মশালা আয়োজন করার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তারা শিশুনিলয় ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, স্মার্ট প্রকল্পের এমন ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে চৌগাছার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা খুব শিগগিরই দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবেন এবং নিজেদের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে ফেলবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ