দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য প্রায় দুই দশক আগে একটি বিশাল স্বপ্ন দেখেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সেই স্বপ্ন ছিল ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘ ১৯ বছর পার হলেও সেই স্বপ্ন আজও পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। তবে ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা এখন জোরালো দাবি তুলেছেন, বর্তমান ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার। এর মাধ্যমে দেশনেত্রীর সেই পুরোনো ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি খুব সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন পরিস্থিতির কারণে সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি মাঝপথেই থমকে যায়। তবে এই অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থের কথা ভেবে ২০০৬ সালে বিকল্প হিসেবে ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। পরে ২০১৩ সালে কলেজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তখন কথা ছিল, বিএনপি আবারও ক্ষমতায় এলে এটিকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চরম অবহেলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ধুঁকতে থাকে। বাজেটে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো না। এমনকি এর অস্তিত্ব সংকটে পড়লে ২০২৩ সালে এটিকে বাধ্য হয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অধীনে একটি ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ হিসেবে যুক্ত করা হয়।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের মতে, এখন সময় এসেছে কলেজটিকে তার হারানো সম্মান ও স্বতন্ত্র পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার। বর্তমানে এই ভেটেরিনারি অনুষদের নিজস্ব ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ১০ দশমিক ১৭ একর। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। যদি প্রতিষ্ঠানটির ঠিক পাশেই থাকা সাধুহাটি বিএডিসি বীজ উৎপাদন কেন্দ্র, সাগান্না বাঁওড়, হলিধানি রেশম বীজ উৎপাদন খামার এবং ঝিনাইদহ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে এক ছাতার নিচে আনা যায়, তবে সম্ভাব্য ক্যাম্পাসের আয়তন ৩০০ একরেরও বেশি হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এত বিশাল জায়গা ১০০% উপযুক্ত।
নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে গেলে সরকারের অন্তত ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু ঝিনাইদহে সেই বিপুল পরিমাণ টাকা অনায়াসেই বাঁচানো সম্ভব। কারণ ক্যাম্পাসের ভেতরে আগে থেকেই আধুনিক একাডেমিক ভবন, উন্নত ল্যাবরেটরি, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ডেইরি, ছাগল ও পোল্ট্রি খামার, অডিটোরিয়াম এবং শিক্ষার্থীদের থাকার মতো চমৎকার আবাসন সুবিধা রয়েছে। এছাড়া ভেটেরিনারি কলেজের মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই গড়ে উঠেছে সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং ফলিত পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এসব অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে খুব অল্প খরচেই এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা যায়।
ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাগান্না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলা উদ্দিন আল মামুন এই দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নের কথা ভেবেই এই বিশাল স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর সেই চমৎকার ও দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল হিসেবেই মূলত ভেটেরিনারি কলেজের যাত্রা শুরু হয়। আজ যখন আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ দুটোই আছে, তখন দেশনেত্রীর সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। এটি করা হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের কণ্ঠেও একই সুর শোনা যাচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও যমুনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি নাসিম আনসারী মনে করেন, এটি এখন আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দাবি নয়, বরং এটি সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। এই এলাকার মানুষের আয়ের প্রায় ৬০% আসে সরাসরি কৃষিকাজ থেকে। তাই কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষকের স্বার্থে এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক এম এ কবির জানান, এই এলাকার বিদ্যমান অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ এবং চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিলে খুব সহজেই ভেটেরিনারি কলেজকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়।
ঝিনাইদহ জেলা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবুল বাশার এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটি কেবল ঝিনাইদহ জেলার একার দাবি নয়, এটি পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের একটি বড় প্রশ্ন। এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন হবে। এলাকার হাজার হাজার বেকারের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি আনতে সাহায্য করবে।
দীর্ঘ ১৯ বছরের অপেক্ষার প্রহর গুণছেন ঝিনাইদহবাসী। তারা মন থেকে বিশ্বাস করেন, সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়। এই একটিমাত্র সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। এখন শুধু দরকার সরকারের একটি ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপ।














