শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির সাঁড়াশি অভিযান: বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ, স্বস্তিতে সীমান্তবাসী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি: সীমান্ত জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সবসময়ই মাদক চোরাচালানের জন্য একটি সংবেদনশীল রুট হিসেবে পরিচিত। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এই অশুভ তৎপরতা বন্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পৃথক দুটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ করেছে ৫৩ বিজিবির সদস্যরা। গতকাল ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখে পরিচালিত এই অভিযানগুলোতে বিজিবি তাদের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। গভীর রাতে এবং সন্ধ্যায় পরিচালিত এই দুই অভিযানে বিজিবি চোরাকারবারিদের বড় একটি চালান পণ্ড করে দিতে সক্ষম হয়। এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সচেতন মহলে স্বস্তি বিরাজ করছে।

প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় গতরাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটের দিকে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর অধীনস্থ ফতেপুর বিওপির একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শিবগঞ্জ থানাধীন দুর্লভপুর ইউনিয়নের গাইপাড়া গ্রামে অবস্থান নেয়। রাতের আঁধারে চোরাকারবারিরা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের চেষ্টা করছিল। বিজিবির উপস্থিত টের পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা মালামাল ফেলে অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যায়। তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে ৪৮ বোতল ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। বিজিবি সদস্যরা ১টি এলাকাকে ঘিরে ফেলে তল্লাশি জোরদার করলেও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে বিজিবির এই অতর্কিত অভিযান চোরাকারবারিদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ রাত ৯টা ৩০ মিনিটে মনোহরপুর বিওপির অপর একটি দল একই ইউনিয়নের রামনাথপুর গ্রামে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালনা করে। বিজিবির টহল দল নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে গ্রামটিতে নজরদারি বাড়ালে সন্দেহভাজন কিছু গতিবিধি লক্ষ্য করে। এরপর বিজিবি সদস্যরা ধাওয়া করলে চোরাকারবারিরা তাদের কাছে থাকা বস্তাগুলো ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। বস্তাগুলো খুলে দেখা যায়, সেখানে আরও ৭৪ বোতল এস্কাফ সিরাপ রয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শিবগঞ্জের এই একটি ইউনিয়ন থেকেই বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা বিজিবির জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, বিজিবি যদি এভাবে প্রতিদিন পাহারা দেয়, তবে মাদকের অভিশাপ থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বিজিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই দুটি অভিযানে জব্দকৃত মোট ১২২ বোতল মাদকের আনুমানিক বাজার মূল্য ৪৮,৮০০/- (আটচল্লিশ হাজার আটশত) টাকা। প্রতিটি বোতলের দাম বর্তমানে ৪-৫ গুণ বেড়ে যাওয়ায় চোরাকারবারিরা সীমান্ত দিয়ে এগুলো পাচারের চেষ্টা বাড়িয়ে দিয়েছে। জব্দকৃত এই মাদকদ্রব্যগুলো বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানায় জমা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এস্কাফ সিরাপ বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ফেন্সিডিলের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বিজিবির এই তৎপরতার ফলে প্রায় ১০০% নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, এই চালানের মাধ্যমে অনেক যুবক নেশার অন্ধকার থেকে রক্ষা পেয়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবির এই যুদ্ধ কেবল এই দুই অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি জুলাই মাসে ৫৩ বিজিবি সীমান্তে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ১ জন আসামিসহ মোট ১৪৭ বোতল নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ, ৬৪ বোতল ফেয়ারডিল সিরাপ এবং আরও ৪৬ বোতল অন্যান্য মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে। এই মাসেই জব্দকৃত মাদকের আনুমানিক বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১,৫৩,৫০০/- (এক লক্ষ তেপ্পান্ন হাজার পাঁচশত) টাকা। বিজিবির কড়া পাহারার কারণে মাদক পাচারকারীরা এখন আগের মতো নির্ভয়ে সীমান্তে চলাফেরা করতে পারছে না। ৫৩ বিজিবির সদস্যরা প্রতিদিন তাদের সীমানা পাহারা দেওয়ার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করা বিজিবির প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, “আমাদের ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পুশ-ইন প্রতিরোধসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ চোরাচালান রোধে বিজিবি বদ্ধপরিকর।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়নে ৫৩ বিজিবি সবসময় তৎপর রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ১০০% সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে বিজিবি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কাম্য করে।

সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিবগঞ্জ এলাকাটি ভারতের খুব কাছে হওয়ায় এখানে চোরাচালানের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। তবে ইদানীং বিজিবির বিশেষ টহল এবং ড্রোন নজরদারির মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চোরাকারবারিদের নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মাদকের ব্যবসা বন্ধ হলে এলাকায় অপরাধের হার কমে আসবে। ৫৩ বিজিবির সদস্যরা যেভাবে রাত-দিন এক করে সীমান্তে পাহারা দিচ্ছেন, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার বোধ কাজ করছে। তারা আশা করেন, ভবিষ্যতে বিজিবি তাদের এই কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জকে একটি মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলবে।

পরিশেষে, ৫৩ বিজিবির এই ধারাবাহিক সাফল্য মাদক ব্যবসায়ীদের একটি কড়া বার্তা দিয়েছে। জব্দকৃত মাদকগুলো ধ্বংসের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে এবং শিবগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযানের মাত্রা আরও বাড়ানো হবে এবং সীমান্তে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক আমদানির প্রতিটি রুট চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। বিজিবির এই নিরলস পরিশ্রমের ফলেই সীমান্ত অঞ্চল আজ চোরাচালানমুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ