বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্ব মানেই স্পেনের জন্য যেন এক দীর্ঘদিনের আক্ষেপ আর হতাশার গল্প। ২০১০ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে টানা তিন আসরে নকআউটে কোনো জয়ের মুখ দেখেনি দলটি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল, আর ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর বাধা পেরোতে পারেনি। তবে আজ লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে সেই হতাশার কালো অধ্যায়ের চিরতরে ইতি টেনেছে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের তরুণ ও আক্রমণাত্মক দল। শেষ বত্রিশের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে পুরো ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে একটি দারুণ জয় তুলে নিয়েছে স্পেন।
আজকের ম্যাচে স্পেন ঠিক কতটা দাপট দেখিয়ে খেলেছে, ৩-০ স্কোরলাইনই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে ম্যাচের আরও কিছু পরিসংখ্যান দেখলে স্পেনের এই একচেটিয়া আধিপত্যের চিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। পুরো ৯০ মিনিটের ম্যাচে স্পেনের খেলোয়াড়রা অস্ট্রিয়ার গোলমুখে মোট ২৩টি শট নিয়েছে, যার মধ্যে ১০টি শটই ছিল সরাসরি অন টার্গেট বা লক্ষ্যে। অন্যদিকে, পুরো ম্যাচে অস্ট্রিয়া মাত্র ৫টি শট নিতে পেরেছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তারা এর একটি শটও স্পেনের গোলমুখে রাখতে পারেনি। অর্থাৎ, স্পেনের গোলরক্ষককে এই ম্যাচে প্রায় কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি। স্পেনের বলের দখল ছিল প্রায় ৬৫%, যা আধুনিক ফুটবলে বিশাল একটি সুবিধা।
লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে রেফারির প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই অস্ট্রিয়ার ওপর আক্রমণের ঝড় তোলে স্পেন। খেলা শুরুর প্রথম মিনিটেই আলেক্স বায়েনার দারুণ এক পাসে তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল গোলের একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাজারের অসাধারণ এক সেভের কারণে সেটি আর গোলে পরিণত হতে পারেনি। ২৯ মিনিটের মাথায় স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া একটি জোরালো শটে বল ঠিকই জালে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। স্পেনের খেলোয়াড়রা উদ্যাপনও শুরু করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ভিএআর (VAR) পর্যালোচনার পর দেখা যায়, গোলের ঠিক আগে পাউ কুবারসি একটি ফাউল করেছিলেন। ফলে রেফারি গোলটি বাতিল করে দেন।
তবে গোল বাতিল হলেও স্পেনের আক্রমণের ধার একটুও কমেনি এবং তাদের গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হয়নি। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে পেদ্রির দুর্দান্ত এক দৌড়ে তৈরি হওয়া আক্রমণে বাঁ দিক দিয়ে উঠে আসেন কুকুরেয়া। তিনি বক্সের ভেতর একটি দারুণ নিচু ক্রস বাড়ান। আর সেই ক্রসে খুব কাছ থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোলরক্ষক শ্লাজারকে পরাস্ত করে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড মিকেল ওইয়ারসাবাল। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুধু নরওয়ের আর্লিং হলান্ডই তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন। এটি ছিল স্পেনের জার্সিতে ওইয়ারসাবালের ১৬তম আন্তর্জাতিক গোল।
প্রথম গোলের পর স্পেন আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। প্রথমার্ধের যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে বায়েনার একটি ফ্রি-কিক দুর্ভাগ্যজনকভাবে পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে ইয়ামাল খুব কাছ থেকে একটি জোরালো শট নেন, কিন্তু সেটিও অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক শ্লাজার। মূলত শ্লাজারের এই সেভগুলোই প্রথমার্ধে অস্ট্রিয়াকে আরও বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া থেকে বাঁচিয়েছিল। বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রিয়া ম্যাচে ফেরার সবচেয়ে বড় সুযোগটি পেয়েছিল। ৬১ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই সাবিটসারের একটি নিখুঁত ক্রস থেকে প্রায় ফাঁকায় হেড করেছিলেন সাসা কালাইজিচ। কিন্তু খুব কাছ থেকে নেওয়া তাঁর সেই হেড ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়।
অস্ট্রিয়া সেই সুযোগ নষ্ট করায় তাদের চরম মূল্য দিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে কুকুরেয়া মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে বায়েনার কাছে দেন। বায়েনার চমৎকার কাটব্যাক থেকে ছুটে এসে দারুণ এক হেডে বল জালে পাঠান পেদ্রো পোরো। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে এটিই ছিল তাঁর প্রথম গোল, আর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে স্পেন কার্যত ম্যাচের ভাগ্যও নিশ্চিত করে ফেলে। এরপরও স্পেনের আক্রমণ থামেনি। ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে সেই কুকুরেয়ার নিখুঁত পাস ধরে নিচু শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ওইয়ারসাবাল এবং স্পেনের ৩-০ ব্যবধানের বিশাল জয় ১০০% নিশ্চিত করেন।
এই দাপুটে জয়ে শেষ ষোলোয় বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। সেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল অথবা লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়া। স্পেনের এই আক্রমণাত্মক ফুটবল দেখে ভক্তরা এখন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।














