ফুটবলকে কেন অনিশ্চয়তার খেলা বলা হয়, তার আরও একটি বড় প্রমাণ মিলল লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে। ম্যাচের ৯০ মিনিটের নির্ধারিত খেলা ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। রেফারি চতুর্থ অফিশিয়ালের মাধ্যমে জানালেন, ইনজুরি টাইম বা যোগ করা সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫ মিনিট। দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড় ও ভক্তরা তখন মনে মনে হয়তো অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের হিসাব কষতে শুরু করেছিলেন। আর মাত্র এই ৫টি মিনিট নিজেদের জাল ১০০% অক্ষত রাখতে পারলেই তারা কানাডাকে অন্তত অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তাদের সেই আশায় একেবারে জল ঢেলে দিলেন কানাডার মিডফিল্ডার স্টিভেন ইউস্টাকিও।
যোগ করা সময়ের ঠিক দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিট) বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া এক দূরপাল্লার বুলেট গতির শটে কানাডাকে স্বপ্নের গোলটি এনে দেন ইউস্টাকিও। আর শেষ মুহূর্তের এই একটি মাত্র গোলেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো বা ‘রাউন্ড অব সিক্সটিন’-এ ওঠার ইতিহাস গড়ল কানাডা। এবারের বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর প্রথম ম্যাচ ছিল এটি। একই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডা—উভয় দলের জন্যই এটি ছিল তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম কোনো নকআউট ম্যাচ। দুই দলই এর আগে একাধিকবার বিশ্বকাপ খেললেও কখনোই প্রথম পর্ব বা গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। তাই এবার গ্রুপের চৌকাঠ পেরিয়ে আসার পর দুই দলেরই প্রধান লক্ষ্য ছিল অন্তত শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করা।
ম্যাচের প্রথমার্ধে অবশ্য দুই দলকেই বেশ সতর্ক ও রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা যায়। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড় দিতে রাজি ছিল না। তবে শুরু থেকেই ম্যাচের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত কানাডার হাতে। বলের দখলে দক্ষিণ আফ্রিকা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, আক্রমণের ধার বিচারে কানাডাকেই বেশি ক্ষুরধার মনে হয়েছে। প্রথমার্ধেই অন্তত দুবার এগিয়ে যেতে পারত কানাডার কোচ জেসি মার্শের দল। কর্নার কিক থেকে তারা একাধিকবার গোলের দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার জমাট রক্ষণভাগের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা গোলের মুখ দেখতে পায়নি।
ম্যাচের ৪৪তম মিনিটে কানাডার ময়জে বমবিতো দারুণ এক হেড নিয়েছিলেন, কিন্তু বল গোললাইন পার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অব্রে মদিবা তা ক্লিয়ার করে দেন। এরপর ফিরতি বলে তেজন বুকানান জোরালো শট নিলেও দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস তা অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন। বিরতির ঠিক আগে কানাডার খেলোয়াড় রিচি লারিয়াকে বক্সের ভেতর ফেলে দেওয়ার ঘটনায় পেনাল্টির জোরালো আবেদন করেছিল কানাডা শিবির। কিন্তু রেফারি ভিএআর (VAR) বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সাহায্য নেওয়ার পরও পেনাল্টি দেননি। এই সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন কানাডার কোচ জেসি মার্শ। প্রথমার্ধ শেষে মাঠ ছাড়ার সময়ও তাঁকে রেফারির প্রতি নিজের অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ার্ধেও মাঠের চিত্র খুব একটা বদলায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন শুরু থেকেই গোল না খেয়ে অতিরিক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা নিজেদের অর্ধে অনেক বেশি খেলোয়াড় রেখে কানাডার আক্রমণ ঠেকাতেই তাদের ১০০% মনোযোগ দিয়েছিল। এর মাঝেই কানাডার তানি ওলুওয়াসেয়ি একবার একা বল নিয়ে গোলরক্ষকের সামনে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি উইলিয়ামসকে পরাস্ত করতে পারেননি। এরপর ফিরতি বলে জনাথন ডেভিডের প্রচেষ্টাও দারুণভাবে ব্যর্থ করে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার এমবেকেজেলি এমবোকাজি।
ম্যাচের মাঝপথে কানাডা দলে বড় একটি পরিবর্তন আসে। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন তাদের সবচেয়ে বড় তারকা আলফন্সো ডেভিস। টুর্নামেন্টে চোট কাটিয়ে এই প্রথম খেলতে নেমে তিনি দলের আক্রমণে কিছুটা গতি আনলেও ম্যাচের গোলশূন্য চিত্র খুব একটা বদলাতে পারেননি। সবকিছুই যখন ড্রয়ের দিকে এবং অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে সেই জাদুকরী মুহূর্ত।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে কানাডার অ্যালিস্টার জনস্টনের একটি ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন ডিফেন্ডার হেডে বলটি ডি-বক্সের ঠিক বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেখানে সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে ছিলেন ইউস্টাকিও (৭ নম্বর জার্সি)। তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বুক দিয়ে বলটি মাটিতে নামিয়ে একমুহূর্ত দেরি না করে নিচু ও জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। গোলরক্ষক উইলিয়ামস ডাইভ দিয়েও সেই শট ঠেকাতে পারেননি। এর আগপর্যন্ত ম্যাচে দারুণ ৫টি সেভ করেও শেষ পর্যন্ত তাকে গোল হজম করে চোখের জলে মাঠ ছাড়তে হয়।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠা কানাডার সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ৪ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে তারা খেলবে ইউরোপের শক্তিশালী নেদারল্যান্ডস অথবা আফ্রিকার আরেক চমক মরক্কোর বিপক্ষে।














