পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। “সবুজে গড়ি পরিবেশ, সুন্দর হোক বাংলাদেশ” এই চমৎকার ও যুগোপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ ও চারা গাছ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রবিবার, ২৮ জুন সকাল ১১টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নামোশংকরবাটী উচ্চ বিদ্যালয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে ব্র্যাকের এমন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ও অভিভাবক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
ব্র্যাকের স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক পরিচালিত ৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এলাকার ১০০টি স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মোট ১৩ হাজার ৪৮৪টি গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে। এসব চারার মধ্যে ফলজ, বনজ এবং ঔষধি এই তিন ধরনের গাছের চারা রাখা হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা।
রবিবার সকালে নামোশংকরবাটী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসলাম কবীরের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির ডিভিশনাল ম্যানেজার রাজ কেশর রায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ জোগান ব্র্যাকের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. ফেরদৌস হোসেন তালুকদার, জেলা প্রতিনিধি মোছা. মোমেনা খাতুন, উপজেলা ব্যবস্থাপক এস. এম. রফিকুল ইসলাম এবং কর্মসূচি সংগঠক মো. সাইফুল ইসলাম। এছাড়া বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং স্থানীয় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এই মহতী আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক ও সময়োপযোগী আলোচনা করেন। তারা বলেন, বর্তমানে পুরো বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। আমাদের দেশে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে বন্যা ও খরা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও আবহাওয়া ঠিক রাখতে এর মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশ কম। তাই এই পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এবং দেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই।
বক্তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে সবার নজর আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, শুধু ঘটা করে গাছ রোপণ করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রোপণ করা সেই ছোট চারাগুলো যাতে গবাদিপশু বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত সংরক্ষণ ১০০% নিশ্চিত করতে হবে। একটি গাছ বড় হয়ে পরিবেশকে তার শতভাগ সুবিধা দিতে বেশ কয়েক বছর সময় নেয়। তাই শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে একটি পরিবেশবান্ধব মানসিকতা গড়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে এই শিশুরাই একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বক্তারা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি এই চারাগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সম্পদ। একটি পূর্ণবয়স্ক ফলদ বা বনজ গাছ কয়েক বছর পর বিক্রি করলে বা এর ফল বাজারে বিক্রি করলে অনায়াসেই ৫০থেকে১০০(ডলার) বা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তাই এই গাছগুলো শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং তাদের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবেও কাজ করবে। ব্র্যাকের এই চমৎকার উদ্যোগের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার হাজার হাজার শিক্ষার্থী আজ নিজেদের হাতে গাছ লাগানোর সুযোগ পেয়েছে, যা আগামী দিনে এই জেলাকে একটি সবুজ ও সতেজ অঞ্চলে পরিণত করবে।














