গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলায় একটি মন্দিরের বাইরে নির্মিত রাম মূর্তি নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এই মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে এলাকার হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার একটি গভীর চক্রান্ত চলছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুক্রবার বাদ জুমা গাইবান্ধা বড় মসজিদ সংলগ্ন গোল চত্বরে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে ‘গাইবান্ধা সচেতন নাগরিক ফোরাম’। জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদ থেকে সাধারণ মানুষ খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে এই সমাবেশে এসে যোগ দেন।
সমাবেশে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে স্থানীয় আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত জোরালো ও আবেগময় বক্তব্য রাখেন। গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বড় মসজিদের খতিব মুফতি মো. মাহমুদুল হাসান কাশেমী, সচেতন নাগরিক ফোরামের সদস্য সচিব মো. আব্দুল মাজেদ, মুফতি আল আমিন বিন হোসাইন এবং মুফতি ইদ্রিস আলী উপস্থিত জনতার সামনে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। এছাড়াও মওলানা এনামুল হাফিজ, মওলানা হাফিজ মানসুর, মাওলানা আবুল বাশার, মো. জহুরুল হক সরকার, মো. মনিরুজ্জামান সবুজ, মুফতি আব্দুল আজিজ, মো. মওদুদ আহমেদ, মো. আবু সাইদ এবং মুনতাকিনুজ্জামান প্রমুখ নেতা এই প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে বক্তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের দাবি তুলে ধরেন। তারা বলেন, পলাশবাড়ীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করবেন, এতে মুসলমানদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মন্দিরের বাইরের উন্মুক্ত স্থানে রামের বড় মূর্তি নির্মাণ করাটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বক্তারা বলেন, “রাম তাদের পূজার দেবতা, রাম থাকবে তাদের মন্দিরের ভেতরে বা ঘরে। রাম কেন রাস্তার পাশে বা মন্দিরের বাইরে থাকবে?” তারা মনে করেন, উসকানিমূলকভাবে এই মূর্তিটি এমন জায়গায় বানানো হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ১০০% বিভেদ ও দাঙ্গা তৈরি করা যায়।
বক্তারা শুধু স্থানীয় ইস্যু নিয়েই কথা বলেননি, তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চরম জুলুম ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সেখানে অনেক পুরোনো মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং মুসলমানদের স্বাধীনভাবে নামাজ পড়তে পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। ভারতের মুসলমানরা আজ সেখানে চরম প্রতিকূলতা ও আতঙ্কের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গাইবান্ধার এই সমাবেশ থেকে ভারতের এই অমানবিক নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় এবং অবিলম্বে সেখানে মুসলমানদের জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি তোলা হয়।
আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৯০% মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এবং তারা একে অপরের ধর্মীয় উৎসবে যোগ দেন। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল মাঝে মাঝেই এমন স্পর্শকাতর ইস্যু তৈরি করে সমাজে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করে। সমাবেশ থেকে সাধারণ মানুষকে এই ধরনের উসকানির ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়। বক্তারা বলেন, আমরা আমাদের দেশে কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেব না, তবে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর কেউ আঘাত করলে আমরা চুপ করেও বসে থাকব না।
বড় মসজিদের সামনে এই বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ শেষ হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি গাইবান্ধা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা রাম মূর্তি অপসারণ এবং ভারতের মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দেন। মিছিলের কারণে শহরে কিছুক্ষণ যানজট থাকলেও, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
এদিকে, শুধু গাইবান্ধা শহরেই নয়, পলাশবাড়ী উপজেলাতেও এই ইস্যু নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। পলাশবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে ‘অসাম্প্রদায়িক সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানেও স্থানীয় মানুষ দ্রুত ওই রাম মূর্তি অপসারণের দাবি জানান। প্রশাসন যদি দ্রুত এই স্পর্শকাতর বিষয়টির কোনো সম্মানজনক ও আইনি সমাধান না করে, তবে আগামী দিনে এই আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন।














