ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ মৃদু ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল নিয়ে ধোঁয়াশা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সোমবার রাতের বেলা সাধারণ মানুষ যখন সারা দিনের কাজ শেষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করে একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আজ রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাটি কেঁপে উঠলে মানুষের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা বহুতল ভবনে বা উঁচু ফ্ল্যাটে থাকেন, তারা এই কম্পন বেশ ভালোভাবে টের পেয়েছেন। অনেকেই ভয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসার চেষ্টা করেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভূমিকম্পের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে দেশের কোথাও কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্র এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি দ্রুত নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবির প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সোমবার রাত ঠিক ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে এই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪। সাধারণত রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে ‘মৃদু’ ভূমিকম্প হিসেবেই ধরা হয়। এই মাত্রার ভূমিকম্পে বড় কোনো ভবন ধসে পড়ার বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা খুব একটা থাকে না, তবে মানুষের মনে ভয় তৈরি করার জন্য এটি যথেষ্ট।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল কোথায় ছিল, তা নিয়ে শুরুতে কিছুটা ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রথমদিকে জানিয়েছিল যে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল খোদ ঢাকাতেই। কিন্তু পরে তারা নিজেদের তথ্য সংশোধন করে জানায়, ভূমিকম্পের আসল উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছেই অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায়। হিসাব করে দেখা গেছে, ঢাকার আগারগাঁও আবহাওয়া অফিস থেকে এই উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব পূর্ব দিকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থল রাজধানীর এত কাছে হওয়ায় ঢাকার মানুষ এই কম্পন এত স্পষ্টভাবে অনুভব করেছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তথ্যও এর সাথে অনেকটা মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) তাদের ওয়েবসাইটে এই ভূমিকম্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪, যা আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া মাত্রার চেয়ে সামান্য একটু বেশি। ইউএসজিএস আরও জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ভূ-পৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূ-পৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকে, তার কম্পন সাধারণ মানুষ তত বেশি এবং তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে।

আমাদের দেশ ভৌগোলিকভাবে একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বড় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে, যেগুলোর কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যদি রিখটার স্কেলে ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার কোনো বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের একটি পুরোনো পরিসংখ্যানে বলা হয়েছিল, ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭০% ভবন ধসে পড়তে পারে এবং অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সাধারণ মানুষকে ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকতে হবে। ভূমিকম্প শুরু হলে দ্রুত ফাঁকা জায়গায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ঘরের ভেতরে মজবুত কোনো টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে ভালো উপায়। আজকের এই মৃদু ভূমিকম্প আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল যে, প্রকৃতির ওপর আমাদের কোনো হাত নেই। তাই সরকার ও সাধারণ মানুষ সবাইকেই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই ১০০% প্রস্তুত থাকতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ