কাগজে-কলমে ইরানকে কখনোই ‘আন্ডারডগ’ বা দুর্বল দল বলা যায় না। বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ২২ নম্বরে, যা আর্লিং হলান্ডের নরওয়ে এবং মেহাম্মদ সালাহর মিসরের মতো দলের চেয়েও ওপরে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে ইরানকে সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতা এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে স্বাগতিক দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের মারাত্মক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সংঘাত শুরু হয়। এই যুদ্ধের ছায়া তাদের বিশ্বকাপ অভিযানে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, ইরান হয়তো এই মানসিক চাপ নিয়ে মাঠে ভালো কিছু করতে পারবে না।
ফলে বিশ্বকাপের আগে ইরানের মাঠের ফুটবলের চেয়ে তাদের দেশের রাজনীতিই বেশি আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু সেই সব জল্পনা-কল্পনার জবাব ইরান যেন মাঠেই দিয়ে দিল। প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ গোলে দারুণ ড্র করার পর, আজ লস অ্যাঞ্জেলেসে তারা রুখে দিয়েছে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়ামকেও। ইরানের অসাধারণ ও জমাট রক্ষণভাগের কল্যাণে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্র হয়। কয়েক দিন আগে যুদ্ধের ময়দানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যেমন কড়া জবাব দিয়েছিল ইরান, সেই একই লড়াকু স্পিরিট যেন তারা আজ খেলার মাঠেও ফিরিয়ে এনেছে। অন্তত আজ বেলজিয়ামের বিপক্ষে রক্ষণে ইরানের যে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখা গেছে, তাতে এমন কথাই মনে হতে বাধ্য।
পুরো ম্যাচে নিজেদের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে জাল ১০০% অক্ষত রেখেছে ইরানের রক্ষণভাগ এবং তাদের গোলরক্ষক। বিশেষ করে গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দ আজ ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই চীনের প্রাচীরের মতো। তিনি একাই এই ম্যাচে ৭টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ সেভ করেছেন। এর মধ্যে কোনো কোনো সেভ ছিল স্রেফ অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে ম্যাচের ৬০ মিনিটে বেলজিয়ামের একটি নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা তিনি যেভাবে রুখে দিয়েছেন, সেটাকে অনেক বিশ্লেষক চলতি বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত সেরা সেভ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
সেই মুহূর্তটি ছিল সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর। বেলজিয়ামের তারকা মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পেনাল্টি এলাকার বাঁ দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনি ছয় গজের বক্সের সামনে আড়াআড়ি একটি নিখুঁত পাস বাড়ান। বলটি গিয়ে পড়ে ম্যাক্সিম ডি ক্রুইপারের ঠিক সামনে। গোল তখন প্রায় ফাঁকাই ছিল, আর ডি ক্রুইপারও ছিলেন একেবারে কাছ থেকে গোল করার জন্য একদম আদর্শ অবস্থানে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত সবাই তখন ধরে নিয়েছিলেন যে, এবার বুঝি বেলজিয়াম গোল করেই ফেলল!
কিন্তু ইরানের গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দের পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। গোলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের বাঁ হাতের পুরোটা প্রসারিত করে বলটি তিনি অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকিয়ে দেন। তাঁর এই সেভটি ফুটবলপ্রেমীদের অনেক দিন চোখে লেগে থাকার মতো। শুধু সেই সেভই নয়, ম্যাচজুড়ে অসংখ্যবার ইরানি রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক বুক চিতিয়ে বেলজিয়ামের আক্রমণগুলো থামিয়েছেন। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ২৩টি শট নিয়েও গোলের দেখা পায়নি বেলজিয়ামের মতো আক্রমণাত্মক দল।
ম্যাচে অবশ্য বেলজিয়াম হারতেও পারত। বিশেষ করে ৬৬ মিনিটে ডিফেন্ডার নাথান এনগয় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর বেলজিয়াম ১০ জনের দলে পরিণত হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এ সময় কয়েকবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ইরান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও গোলের দেখা পায়নি। দুই অর্ধে বেলজিয়ামের হয়ে দারুণ দুটি সেভ করে দলকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। প্রথমার্ধে একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দারুণ এক গোল করেছিল ইরান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অফসাইডের ফাঁদে পড়ায় রেফারি সেই গোলটি বাতিল করে দেন।
বর্তমানে ‘জি’ গ্রুপে এখনো কোনো দল জয়ের মুখ দেখতে পারেনি। বেলজিয়াম ও ইরান নিজেদের দুটি ম্যাচ ড্র করে ২টি করে পয়েন্ট পেয়েছে। অন্যদিকে মিসর ও নিউজিল্যান্ড একটি করে ম্যাচ খেলে পেয়েছে ১টি করে পয়েন্ট। গোল পার্থক্যের কারণে ইরান আপাতত গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করছে, আর দুইয়ে আছে বেলজিয়াম। তিনে নিউজিল্যান্ড ও চারে আছে মিসর। এই গ্রুপের লড়াই এখন আরও জমে উঠেছে।














