গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বোনারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ওই নেতার নাম সাইফুল্লাহ বারী। তিনি বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। এই হামলায় সালাউদ্দিন নামের আরেক শিবির কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। নিহত সাইফুল্লাহ বারী উপজেলার শিমুল তাইড় গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। এই বর্বরোচিত হামলায় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ, পুলিশ এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। রোববার বিকেলে সাঘাটা উপজেলার কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি বা ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে সাঘাটা উপজেলা পরিষদ চত্বরে একটি দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লার সঙ্গে কমিটি গঠন নিয়ে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুল মিয়ার চরম কথা-কাটাকাটি হয়। একজন শিক্ষকের সঙ্গে যুবদল নেতার এমন খারাপ আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানান সেখানে উপস্থিত থাকা বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ এবং তার কর্মী সালাউদ্দিন। তাদের এই প্রতিবাদের পর সেখানে বেশ উত্তেজনা ছড়ায়। তবে পরে দুই পক্ষের স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে এবং সমঝোতায় বিষয়টি প্রাথমিকভাবে মীমাংসা করে দেওয়া হয়।
উপজেলা চত্বর থেকে মীমাংসা করে সবাই চলে যাওয়ার পর ঘটনা সেখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মীমাংসার কয়েক মিনিট পর শিবির নেতা সাইফুল্লাহ ও কর্মী সালাউদ্দিন বোনারপাড়া চৌমাথায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঠিক সেই মুহূর্তে যুবদল নেতা মুকুল মিয়া ও তার ছোট ভাই পলাশের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৩ জনের একটি সশস্ত্র দল সেখানে আসে। তাদের সাথে ছিলেন বোনারপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য রবিউল ইসলাম, যুবদল নেতা আশরাফ, মোনারুল ও জব্বার। তারা হাতে ধারালো অস্ত্র ও ছুরি নিয়ে প্রথমে সালাউদ্দিনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা নির্মমভাবে সালাউদ্দিনের গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে সজোরে আঘাত করে।
সালাউদ্দিনকে বাঁচাতে ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ দ্রুত এগিয়ে আসেন। কিন্তু হামলাকারীরা তাকেও ছাড়েনি। তারা সাইফুল্লাহকে ধাওয়া করে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনের রাস্তার ওপর ফেলে দেয়। এরপর সবার সামনেই অত্যন্ত নির্মমভাবে তার গলায় ছুরি দিয়ে আঘাত করে। সাইফুল্লাহ ও সালাউদ্দিন দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছটফট করতে থাকেন। এই নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে হামলাকারীরা দ্রুত নিজেদের মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে আহত দুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক সাইফুল্লাহকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, গুরুতর আহত শিবির কর্মী সালাউদ্দিনের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়া জিয়াউর রহমান হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনায় সাঘাটা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাজেদুর রহমান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সরাসরি স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতাদের দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সাথে সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, তার ছোট ভাই পলাশ এবং বোনারপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য রবিউল ইসলাম সরাসরি জড়িত। একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে তারা যে নোংরা রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে, আমরা তার ১০০% সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তবে হত্যার সঙ্গে বিএনপি বা এর কোনো সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সাঘাটা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী। তিনি মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানান, “এটি একটি মর্মান্তিক ঘটনা, তবে এর সাথে আমাদের দলের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো পুরোনো দ্বন্দ্বের জের ধরেই হয়তো এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। একটি দুর্ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দেওয়া ঠিক হবে না।”
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি যে, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছে এবং আসামিদের ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।” তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে এবং শান্ত রয়েছে।














