বাংলাদেশের অর্থনীতি আজও অনেকটাই কৃষির ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের সাধারণ কৃষকদের জীবনমান উন্নত করতে এবং কৃষিকে আরও আধুনিক ও লাভজনক পেশায় পরিণত করতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এরই একটি বড় অংশ হিসেবে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে শুরু হয়েছে নতুন এক কর্মযজ্ঞ। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো ‘পার্টনার কনগ্রেস ২০২৬’। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনরশিপ রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা সংক্ষেপে পার্টনার প্রকল্পের আওতায় উপজেলা কৃষি অফিস এই গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশের কৃষকরা প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। কখনো অসময়ে বৃষ্টি, আবার কখনো তীব্র খরা কৃষকের মুখের হাসি কেড়ে নেয়। এই প্রাকৃতিক ক্ষতি কমিয়ে এনে কৃষিকে একটি টেকসই ও লাভজনক ব্যবসায় রূপ দিতে দেশব্যাপী প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ($) বা বিপুল পরিমাণ অর্থের এক বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করছে পার্টনার প্রকল্প। কনগ্রেসে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা পুষ্টি উদ্যোক্তা তৈরি এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তর নিয়ে উপস্থিত কৃষকদের সামনে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকরা সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এতে তাদের ফসলের উৎপাদন অন্তত ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বাড়বে এবং উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসবে।
এই জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক কৃষিবিদ কামরুজ্জামান। তিনি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ্ দিপা রানী সরকার এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। তাদের উপস্থিতিতে কৃষকদের মাঝে এক নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়। কৃষিকে কীভাবে শুধু নিজেদের খাওয়ার জন্য নয়, বরং ব্যবসার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে প্রধান অতিথি কৃষকদের সাহস জোগান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৃষকরা এখন আর শুধু জমিতে ঘাম ঝরাবেন না, তারা প্রত্যেকেই এক একজন স্মার্ট উদ্যোক্তা হয়ে উঠবেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত থেকে নিজেদের মূল্যবান বক্তব্য রাখেন যশোর অঞ্চলের পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার কৃষিবিদ শেখ সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা দ্বিন ইসলাম এবং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ। এছাড়া অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ আনিসুজ্জামান খান, উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে কৃষকদের নানা পরামর্শ দেন। পুরো অনুষ্ঠানটি খুব সাবলীল ও সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি অফিসার টিপু সুলতান।
কৃষি কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষকদের একটি দারুণ সুখবর দেন। তারা জানান, পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তারা শুধু উন্নত বীজ বা সারই পাবেন না, তারা হাতে-কলমে সঠিক প্রশিক্ষণও পাবেন। আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা হলো, কৃষকরা অনেক সময় হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ভালো ফসল ফলালেও বাজারে গিয়ে সঠিক দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের কারণে তাদের লাভের প্রায় ৪০% থেকে ৫০% টাকা মাঝপথেই গায়েব হয়ে যায়। কৃষকের এই দীর্ঘদিনের কষ্ট ও সমস্যা দূর করতে তাদের সরাসরি বড় বাজারের সাথে যুক্ত করার কাজ করবে এই পার্টনার প্রকল্প। ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিজেদের পকেটে নিতে পারবেন এবং আর্থিকভাবে দ্রুত স্বাবলম্বী হবেন।
তরুণ সমাজকে কৃষিতে টানার বিষয়েও এই কনগ্রেসে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষিত বেকার যুবকেরা যাতে চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক কৃষির মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই তৈরি করতে পারেন, সেজন্য সরকার তাদের নানাভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে। একটি ছোট কৃষি খামার থেকে একজন তরুণ মাসে অনায়াসেই ৫০০থেকে১০০০ডলার সমমূল্যের দেশীয় টাকা আয় করতে পারেন, যদি তিনি সঠিক প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনা বোঝেন। পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল যেমন মাশরুম, ড্রাগন ফল বা নিরাপদ সবজি চাষের মাধ্যমে তারা ‘নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনর’ বা পুষ্টি উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন।
দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে কৃষি অফিসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, প্রকল্পের সুবিধাভোগী সাধারণ কৃষক এবং এলাকার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি খুব আগ্রহ নিয়ে অংশ নেন। তারা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শোনেন এবং নিজেদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। স্থানীয় কৃষকরা দৃঢ়ভাবে আশা করছেন, এই ধরনের মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ তাদের জীবনমান বদলাতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির এই যাত্রা সফল হলে কোটচাঁদপুর উপজেলা আগামী দিনে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি বড় ও সফল মডেল হিসেবে পরিচিতি পাবে।














