তীব্র গরমে জনজীবনে হাঁসফাঁস: কোটচাঁদপুরে ছাতা ও হাতপাখা নিয়ে অসহায়দের পাশে রেড ক্রিসেন্ট

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়ছে পুরো দেশ। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলাতেও তীব্র গরমে জনজীবন একপ্রকার অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনের বেলায় তাপমাত্রা প্রায় ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছে। এর সাথে বাতাসে প্রায় ৮০% আর্দ্রতা থাকায় ভ্যাপসা গরমে মানুষ ঘেমে একাকার হচ্ছেন। এমন হাঁসফাঁস করা গরমে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর ও সাধারণ মানুষ। এই তীব্র তাপদাহে শ্রমজীবী ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমাতে সরাসরি মাঠে নেমেছে কোটচাঁদপুর উপজেলা বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় তারা সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে হাতপাখা ও ছাতা বিতরণ করেছে।

এই প্রশংসনীয় কর্মসূচির প্রথম অংশটি অনুষ্ঠিত হয় কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অসহায় মানুষদের সাহস জোগান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দীপা রাণী সরকার। তিনি নিজের হাতে রোদে পোড়া অসহায় মানুষ এবং বিশেষ করে পঙ্গু রিকশাচালকদের মাঝে ছাতা বিতরণ করেন। প্রখর রোদের মধ্যে একজন রিকশাচালকের জন্য একটি ছাতা যেন স্বর্গের ছায়ার মতো কাজ করে। একটি সাধারণ ছাতার বাজারমূল্য হয়তো ৩(ডলার) হতে পারে, কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষের কাছে এই বিপদের দিনে এর মূল্য অনেক বেশি। এই ছাতা মাথায় দিয়ে তারা অন্তত রোদের তীব্রতা থেকে নিজেদের ১০০% রক্ষা করতে পারবেন এবং হিটস্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

কর্মসূচির দ্বিতীয় অংশটি পরিচালিত হয় কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তীব্র গরমে এবং মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালের ভেতরে ভর্তি থাকা রোগীদের কষ্ট অনেক বেড়ে যায়। গরমের কারণে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সেই রোগীদের একটু স্বস্তি দিতে সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডা. এ. এম. আশরাফুল আলম এবং ডা. প্রতিক। তারা দুজন মিলে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে ভর্তি থাকা অসুস্থ রোগীদের হাতে হাতপাখা তুলে দেন। প্রচণ্ড গরমের যন্ত্রণায় ছটফট করা রোগীরা এমন সময়ে একটি হাতপাখা পেয়ে বেশ আনন্দিত হন। সামান্য বাতাসের এই ব্যবস্থা রোগীদের শারীরিক কষ্ট অন্তত ৫০% কমিয়ে দেবে বলে চিকিৎসকরা আশা প্রকাশ করেন।

মহতী এই মানবিক আয়োজনে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কোটচাঁদপুর উপজেলা দলের সদস্যরা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সুযোগ্য দলনেতা রাশেদুল ইসলাম, উপদলনেতা-১ মরিয়ম খাতুন, উপদলনেতা-২ হাবিবুর রহমান রিংকুসহ কার্যনির্বাহী কমিটির সকল সদস্য। তরুণ এই স্বেচ্ছাসেবকরা দিনরাত পরিশ্রম করে অসহায় মানুষদের একটি তালিকা তৈরি করেন এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাদের হাতে এই উপহারগুলো তুলে দেন। এমন দুর্যোগের মুহূর্তে তরুণ প্রজন্মের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ সমাজের অন্য মানুষদের জন্যও এক দারুণ শিক্ষণীয় বিষয়।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কোটচাঁদপুর উপজেলা দলের পক্ষ থেকে এই চমৎকার আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে উপস্থিত সবাইকে জানানো হয়। তারা স্পষ্ট কণ্ঠে বলেন, সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানো এবং যেকোনো দুর্যোগে তাদের জরুরি সেবা প্রদান করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তীব্র তাপদাহে শ্রমজীবী মানুষ যখন রোদে পুড়ে কষ্ট করছেন, তখন তাদের সেই কষ্ট সামান্য লাঘব করতেই মূলত আমরা এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়েছি। তারা আরও জানান, সমাজের বিত্তবান মানুষরা যদি তাদের জমানো সম্পদের মাত্র ২% বা ৫% অংশও এমন মানবিক কাজে ব্যয় করেন, তবে এই সমাজের কোনো অসহায় মানুষই আর কষ্ট পাবে না।

অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমের কারণে খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সময় অনেক কমে যায়। দুপুরে রোদের তাপে তারা কাজ করতে পারেন না বলে তাদের দৈনিক আয় প্রায় ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পায়। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলো তখন পরিবার নিয়ে চরম অর্থকষ্টে পড়েন। এছাড়া রোদে পুড়ে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অনায়াসেই ৫০$ বা তার বেশি পরিমাণ টাকা খরচ হয়ে যায়, যা একজন গরিব মানুষের পক্ষে বহন করা ১০০% অসম্ভব। একটি ছাতা বা পাখা দিয়ে হয়তো সব সমস্যা দূর হবে না, কিন্তু এটি তাদের সাময়িক সুরক্ষা দেবে।

তাই এই তীব্র তাপদাহে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতো সমাজের অন্যসব বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। সবাই মিলে যদি একযোগে কাজ করে, তবে সাধারণ মানুষের এই গরমের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব হবে। কোটচাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও রেড ক্রিসেন্ট এমন মানবিক কাজগুলো নিয়মিত চালিয়ে যাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ