শৈলকুপার গাড়াগঞ্জে পুলিশের জালে দুই মাদক কারবারি: ৪০ পিস ইয়াবা উদ্ধার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লার সরাসরি দিকনির্দেশনায় পুলিশ একটি সফল ও সাহসী অভিযান চালিয়েছে। উপজেলার গাড়াগঞ্জ এলাকার জিন্না আলম কলেজ মোড় থেকে ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করেছে তারা। পুলিশের এই সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।

আটককৃত দুই মাদক কারবারির পরিচয় নিশ্চিত করেছে শৈলকুপা থানা পুলিশ। তারা হলো বারইপাড়া মোল্লাপাড়া এলাকার আবেদ মোল্লার ছেলে হাসেম মোল্লা এবং একই এলাকার গোলাম কুদ্দুস মোল্লার ছেলে জালাল মোল্লা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই দুজন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা ধরনের সন্দেহজনক কাজের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণদের টার্গেট করে তারা অত্যন্ত গোপনে এই মরণনেশা ইয়াবার ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষ তাদের এই অবৈধ ব্যবসার কথা জানলেও, তাদের ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেত না।

ঘটনার দিন পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, গাড়াগঞ্জ বাজারের কাছে জিন্না আলম কলেজ মোড়ে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ইয়াবা কেনাবেচার জন্য অবস্থান করছে। খবর পাওয়ার পরপরই ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার নির্দেশে পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় সাধারণ পোশাকে ওত পেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর হাসেম ও জালাল সেখানে পৌঁছালে পুলিশের সন্দেহ হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই দুই মাদক কারবারি দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাদের দুজনকে দৌড়ে ধরে ফেলেন। এরপর তাদের শরীর তল্লাশি করে প্যান্টের পকেটে লুকানো অবস্থায় ৪০ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে পুলিশ।

বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক কালো বাজারে খুব কম দামে তৈরি হওয়া একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট তারা সাধারণ তরুণদের কাছে ২থেকে৩থেকে৩ (ডলার) বা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। এই ব্যবসায় তারা প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে থাকে।

মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।

শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা এই অভিযানের বিষয়ে তার অনড় ও কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। এরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টাকার লোভে যারা তরুণদের হাতে এই বিষ তুলে দিচ্ছে, তাদের কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আটক হাসেম ও জালালের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের কাজ শুরু করেছে। তাদের পেছনে এলাকার আরও কোনো বড় হোতা বা গডফাদার আছে কি না, তা বের করতে পুলিশ তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

জিন্না আলম কলেজ মোড়ের মতো একটি পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিক আশপাশে এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় অভিভাবকরা এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই দুই কারবারি পুলিশের হাতে আটক হওয়ায় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা পুলিশের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে।

পুলিশ আটককৃত দুই আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনি প্রক্রিয়া মেনে খুব দ্রুত আদালতে হাজির করবে বলে জানিয়েছে। বিচারকের কাছে পুলিশ তাদের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করতে পারে, যাতে এই ইয়াবার মূল চালান কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এর আসল সরবরাহকারী, সেই প্রকৃত তথ্য বের করে আনা যায়। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ